রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:৪১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দৈনিক আলোকিত উখিয়ায় আপনাকে স্বাগতম

খরুলিয়ার চিহ্নিত ইয়াবা গডফাদার গফুর সিন্ডিকেটের দুর্ভেদ্য জাল !

  • সময় রবিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৯৩৪ বার পড়া হয়েছে

প্রতিদিন পাচার করেন কোটি টাকার ইয়াবা

নিজস্ব প্রতিবেদন::
জেলায় ভয়ঙ্কর ভাবে বেড়েছে ইয়াবা পাচার। প্রদীপ অধ্যায় শেষ হতে না হতেই বের হয়ে আসতে শুরু করেছে সেই সময়ের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের চেহারাগুলো। আইন প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিংবা ম্যানেজ করে যেসকল ব্যবসায়ীরা অতীতে নিরবে নিবৃত্তে চালিয়েছিলো ইয়াবা ব্যবসা তারা এখন অনেকটাই ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে নেমে পড়েছে। প্রশাসনের সৎ মনোভাবকে দুর্বলতা ভেবে ইয়াবা পাচারে দ্বিগুণ বেপরোয়া ভাব নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এসব চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর তৎপরতার মুখে ছোটো খাটো ইয়াবা ব্যবসায়ীরা অধিকাংশই থেমে যেতে বাধ্য হলেও ভৌগলিক অবস্থানগত সুবিধা পেয়ে সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ঝিলংজাস্থ খরুলিয়ার ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। ভদ্রতার মুখোশ পরিধান করে থাকা এসব ইয়াবা ব্যবসায়ী এতটাই সচুতুর যে বাহির থেকে এদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ রাখেনি। ফলে সমাজের সচেতন মহল থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যন্ত সবার চোখে ধুলো দিয়ে প্রতিদিন কোটি টাকার ইয়াবা পাচার করে রাতারাতি বনে যাচ্ছে একেকজন বিশাল বিশাল শিল্পপতি। এমনই যাদুরকাটি তাদের হাতে আছে রীতিমতো বেকুব বনে যান পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তারাও। পান না ইয়াবা পাচারের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা।

নুসন্ধানে জানা যায়- কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়া বাজারপাড়ার নুর মোহম্মদের ছেলে আব্দুল গফুর (৩৮) এদের মধ্যে অন্যতম। তার রয়েছে নিজস্ব সিন্ডিকেট এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমেই পাচার করে যাচ্ছে প্রতিদিন কোটি টাকার ইয়াবা। গফুর স্থানীয় ভাবে বাঘাইয়্যা নামেও পরিচিত। আর ছিদ্দিক হলো তার অন্যতম সহযোগী। সে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মূল ডিলারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে ইয়াবা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে। কাজে দক্ষতার উপর ভিত্তি করে গ্যাং লিডার গফুর তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে বলে জানা যায়। রামু, চাকমারকুল, খরুলিয়া, ঝিলংজা সহ এর আশপাশের হতদরিদ্র অটোরিক্সা (টমটম) চালকদের মোটা অংকের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এসব ইয়াবা পাচারের কাজে ব্যবহার করে গফুর ও তার সিন্ডিকেটের লোকজন। ফলে ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বরাবরের মতো আটক হয় বেতনভুক্ত পাচারকারীরা। কিন্তু অধরাই রয়ে যান নেপথ্যের বড় বড় এসব গডফাদারগুলো।

গত ২০জুলাই রামুর মরিচ্যা থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা সহ বিজিবির হাতে আটক হয় রামু পশিম চাকমারকুল ডেইঙ্গাপাড়া এলাকার হতদরিদ্র অটোরিক্সা চালক মৃত মো. হোছাইনের পুত্র আবুল কালাম প্রকাশ আবুলু। পরে তাকে বিজিবি রামু থানায় হস্তান্তর করলে স্বাভাবিক নিয়মেই তদন্ত শুরু হয়। এর সূত্র ধরে পাচারকারী আবুল কালামের স্ত্রী সন্তানরাও সোচ্চার হয় মূলহোতাকে খুঁজে বের করতে। তাদের দাবী এই জব্দকৃত ওই ইয়াবার মূল মালিক আব্দুল গফুর। শুধুমাত্র একটু বেশি উপার্জনের আশায় আবুল কালাম ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ে থাকতে পারেন বলে তাদের ধারণা। অন্যদিকে তদন্তে পুলিশের কাছে গ্রেফতার আবুলু স্বীকারোক্তিতেও ইয়াবাগুলোর মূল মালিক গফুর ও তার সিন্ডিকেটের বলে দাবী করেন।
এদিকে ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে গ্রেফতার হওয়া আবুল কালাম ও তার স্ত্রী সন্তানের সাথে চিহ্নিত গডফাদার আব্দুল গফুরের সাথে এসংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ আলোচনা ও আর্থিক লেনদেনের একটি ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়- গফুর ও তার সিন্ডিকেটের লোকজন ইদুল আযহার রাতে আবুল কালামের স্ত্রীকে ৫হাজার টাকা হাত খরচ দেন। এবং আবুল কালামকে জামিন করিয়ে নিতে যদি ২০ লাখ টাকাও খরচ হয় তারা করবে বলে আস্বস্ত করেন। পাশাপাশি ২/৩ মাস সময় অপেক্ষাও করতে বলেন।

সম্প্রতি, গফুর ও তার সিন্ডিকেটের লোকজন ইয়াবা পাচারের পুরোনো রুট পরিবর্তন করে নতুন রুট বেছে নিয়েছে। ধরপাকড় থেকে নিরাপদ থাকতে ইয়াবাগুলো স্থানান্তর করে সিন্ডিকেটটির সেকেন্ড ইন কমান্ড একজন আইটি এক্সপার্টের বাসায় রাখা হয়েছে বলে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে। ওই বাড়ি থেকেই মূলত পরবর্তী চালানগুলো জেলার বাইরে যায়। স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত ওই বাড়ি থেকে কমপক্ষে তিনটি বড় বড় চালান গিয়েছে জেলার বাহিরে। কিছুদিন আগেও খরুলিয়া নয়াপাড়ার ওই বাড়ির উঠানে একটি নোহার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যেটিতে করে ৩০ হাজারেরও অধিক একটি বিশাল চালান চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যায়।

এছাড়াও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরও একটি চ্যাঞ্চল্যকর ঘটনা ইয়াবা গডফাদার আব্দুল গফুরের শক্তিমত্তাকে জানান দেয়। রাজধানী ঢাকার একটি ইয়াবা ব্যবসায়ী চক্রকে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা সরবরাহ ও দরদাম নিয়ে ঝামেলা হলে ফাঁস হয় এই দৃশ্য। গফুরের পার্শ্ববর্তী নয়াপাড়া এলাকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রলায়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী বাদশা মিয়ার পূর্বনির্ধারিত ঢাকাই ইয়াবা ব্যবসায়ী পার্টিকে অধিকতর কম মূল্যে ইয়াবা সরবরাহ করেন গফুর। এর ফলে মার্কেট হারায় বাদশা। ব্যবসায়ীক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় এটা নিয়ে গফুর ও বাদশার মাঝে বাকবিত-া এবং সংঘর্ষ হয়। এমনকি বাদশা ও তার লোকজন গফুরের বাড়িতে হামলা পর্যন্ত করে। এছাড়াও গফুর ও তার সিন্ডিকেটের ইয়াবার লেনদেন সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও, কলরেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। যার উপর ভিত্তি করে যাচাই বাছাই শুরু করেছে আমাদের ক্রাইম রিপোর্টার টিম। গফুরের অপকর্মের ফিরিস্তি এতো বেশি যে ক্রাইম টিম সিদ্ধান্ত নিয়েছে গফুর ও তার সিন্ডিকেটের ব্যাপারে পৃথক ৫পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপাবে।

ইয়াবা নিয়ে আবুল আটক হলে তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক ওই ইয়াবার সাথে সংশ্লিষ্ট গফুর ও তার সিন্ডিকেটের খোঁজ নিতে বাড়িতে তদন্তে যান রামু থানার এস.আই মো. মঞ্জু। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান- তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। স্বীকারোক্তি বা অন্যান্য সূত্র ধরে যাদের নাম এসেছে এক এক করে সবার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদেরও এই মামলায় নথিভুক্ত করা হবে। এব্যাপারে তিনি প্রতিবেদকের সহযোগীতাও চেয়েছেন। অন্যদিকে- গফুর ও তার সিন্ডিকেট প্রতিবেদকের কাছে দাম্ভিকতার সাথে দাবী করেন- পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা তাদের বাড়িতে গেলেও ওই ইয়াবা জব্দ ও আবুল কালাম গ্রেফতারের ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতা পায়নি বলেই তাদেরকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন থেকেই যায়- তদন্ত শেষ না হতেই কীভাবে এধরণের অভিযুক্ত লোকজন ও চিহ্নিত ইয়াবা গডফাদাররা নিজেদের নিরপরাধ ঘোষণা দেন। রামু থানার সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মঞ্জুও সাফাই গান অনেকটাই অভিযুক্তদের সুরে।

একটু বেশি উপার্জনের আশায় দরিদ্র পাচারকারীরাই কি শুধুমাত্র মামলার গ্লানি টেনে যাবেন; নাকি মূলহোতারাও আইনের আওতায় আসতে যাচ্ছেন,সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার ভুমিকা এবং জড়িত অপরাপর গডফাদাদের অপতৎপরতার চিত্র তুলে ধরে আগামী পর্বে আসছে বিস্তারিত।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: