শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৬:৫৮ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দৈনিক আলোকিত উখিয়ায় আপনাকে স্বাগতম

আগুনের ভয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

  • সময় শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১
  • ৯৫ বার পড়া হয়েছে

উখিয়ার ২০টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মাঝে ফের বড়সড় অগ্নিকাণ্ডের আশংকায় অজানা আতঙ্ক, ভয়-ভীতি ভর করেছে। দিবারাত্রি পুরো ক্যাম্পের ব্লকে ব্লকে পালা করে পাহারা দিয়ে কঠোরভাবে সর্তকতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ক্যাম্পগুলোর শৃংখলা পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা না হলে নিরাপত্তার অভাবে সাধারণ রোহিঙ্গারা লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ায় আশংকা করা হচ্ছে। গত ২২ মার্চ রোহিঙ্গা আশ্রয় ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে উখিয়ার বালুখালীর ৪টি ক্যাম্পজুড়ে। সেই ঘটনার পর থেকে উখিয়ার ২০ টি ও টেকনাফের ১৪ টি আশ্রয় ক্যাম্পজুড়ে রোহিঙ্গাদের মাঝে ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। ২২ মার্চের পরও বিচ্ছিন্নভাবে কুতুপালং পুরাতন নিবন্ধিত ক্যাম্প, নতুন ক্যাম্প ১/ ওয়েস্ট, ৫, ১৩, ১৪ ও ২০ এ বিচ্ছিন্ন অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রোহিঙ্গারা যেমনটি অজানা আতঙ্কে রয়েছে; তেমনটি অপহরণ, গুম ও খুনের মত ঘটনার ভয়ে কোনো কথা প্রকাশ্যে বলছে না। কিছু রোহিঙ্গা কথা বললেও বিশেষ কারণে নাম পরিচয় গোপন রাখছে।
উখিয়ার কুতুপালং পুরাতন নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হাফেজ জালাল আহমদ বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পগুলোতে যে পরিস্থিতি তা খুবই উদ্বেগের। ক্যাম্পে কোনো রোহিঙ্গা নিরাপদ নয়। তিনি বলেন, বিকেল ৫টার পর ক্যাম্প এলাকায় জরুরি কাজে নিয়োজিত ছাড়া অন্য কারো প্রবেশ ও অবস্থানের অনুমতি নেই। গত ২৫ মার্চ রাত ৯ টার দিকে কুতুপালং ক্যাম্পের এ- ব্লকের একটি ঘরে কে বা কারা আগুন দেয়। রোহিঙ্গারা দ্রুত চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণ করে। ২৮ মার্চ রাত সাড়ে ১২ টার দিকে কুতুপালং ১/ওয়েস্ট লম্বাশিয়া ক্যাম্পে একই কায়দায় আগুন দেয়। ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ও ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত প্রচেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। কিন্তু ওখানে ৩/৪ টি ঘর ও ২ টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২২ মার্চের পর থেকে আরও কয়েকটি ক্যাম্পে দুর্বৃত্তরা আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে বলে রোহিঙ্গারা জানান।
হাফেজ জালাল বলেন, যেখানে বহিরাগত লোকজনের আনাগোনা নিয়ন্ত্রিত, সেখানে এসব অঘটন কারা ঘটাচ্ছে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এসবের পিছনে নিশ্চয় রোহিঙ্গাদের একাধিক গ্রুপ সিন্ডিকেট করে অপকর্ম চালাচ্ছে। এসব সিন্ডিকেটের পেছনে থাকতে পারে ইন্ধন ও অর্থদাতা। এসবের পিছনে মিয়ানমার আর্মির হাত থাকতে পারে বলেও তিনি আশংকা করেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। গত সপ্তাহে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের মত ভয়াবহ ঘটনা অতীতে ঘটেনি। গত ২২ মার্চের অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে নানা জল্পনা ও আলোচনা এলাকাবাসী ও রোহিঙ্গাদের মুখে মুখে। আরও ঘটনার অজানা আতঙ্কে ক্যাম্পগুলোতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে রোহিঙ্গারা। বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা টহল।
বিগত তিন বছরে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয় ক্যাম্পগুলোতে অন্তত ১৮ টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ১৩ হাজার রোহিঙ্গার আশ্রয়স্থল, শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র ও অন্যান্য জরুরি স্থাপনা পুড়ে গেছে। এ ঘটনায় সরকারি হিসাবে ১১ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। আহত হয়েছে ৫ শতাধিক মানুষ। এছাড়া এ ঘটনায় চারটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রায় ১০ হাজার বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়ে ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা গৃহহীন হয়। একই সাথে ক্যাম্প সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের ১২৬ টি বাড়িঘর ও ৬ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও অজানা।
এরআগে এ বছরের ১৩ জানুয়ারি টেকনাফে নয়াপাড়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডে ৫৫২টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ঘটনায় ৩ হাজারের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এর চারদিন পর ১৭ জানুয়ারি উখিয়া পালংখালী শফিউল্লাহ কাটা ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লেগে চারটি লার্নিং সেন্টার পুড়ে যায়। পরে উখিয়া থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া গত ১৯ মার্চ উখিয়ার কুতুপালং ১৭নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৭৩ নম্বর ব্লকে বিদেশি এনজিও সেভ দ্য চিলড্রেন পরিচালিত একটি হাসপাতাল, এর দুইদিন আগে ১৭ মার্চ টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কয়েকটি বাড়ি ভস্মীভূত হয়। এ নিয়ে গত আড়াই মাসে অন্তত ৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। গেল বছরও অগ্নিকাণ্ডে প্রায় এক হাজার বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়। এছাড়া হাসপাতাল, দোকানপাট, মসজিদ, স্কুলসহ আরো প্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়ে যায়। গতবছর ১২ মে উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৬০০ বসতি পুড়ে যায়। এর ৫দিনের মাথায় ১৭ মে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুনে ৩৬২টি বসতঘর ও ৩০টি দোকানপাট পুড়ে যায়। এসব ঘটনায় আরো অর্ধ-শতাধিক রোহিঙ্গা অগ্নিদগ্ধ হয়।
গত বছরের ৮ অক্টোবর কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের সি-ব্লকে আগুন লেগে অর্ধ শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। একই বছরের ২৬ এপ্রিল কুতুপালং রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৪টি দোকান, ১ এপ্রিল চাকমারকুল (পুটিনবনিয়া) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডে স্কুলসহ ১৫ টি বসতঘর ভস্মীভূত হয়।
২০১৯ সালেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে অতীতের সবচেয়ে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারির ঘটনাটি সবচেয়ে হৃদয় বিদারক। এদিন উখিয়ার কুতুপালং ট্রানজিট পয়েন্ট এলাকার তাবুতে আগু লেগে একই পরিবারের নারী শিশুসহ ৪ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়।
রোহিঙ্গাদের সন্দেহ দু’দিকে : সাধারণ অনেক রোহিঙ্গা নাম পরিচয় প্রকাশে অপারগতা জানিয়ে বলেন, বর্ডার খুলে দিলে পারলে এখনই দেশে (মিয়ানমার) চলে যেতাম। এগুলো আর সহ্য হচ্ছে না। বিগত ৭০ বছরেও রোহিঙ্গারা দেশে যে নির্যাতিত, অত্যাচারিত হয়নি, এর চেয়েও বেশি জুলুমের শিকার হচ্ছে বিপদে পড়ে নেয়া আশ্রয় ক্যাম্পে। এধরণের জুলুম অত্যাচার থেকে বাঁচতে অনেকে ভাসানচর স্থানান্তরিত হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের মতে, গত বছরের অক্টোবরের দিকে কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে চিহ্নিত সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা মুন্না গ্রুপের প্রধান মুন্নার ভাই, ভগ্নিপতিসহ ৪ জনকে প্রকাশ্য জবাই করে খুন করে। মূলত সেই থেকে মুন্না ক্যাম্প ছাড়া হয়। আর গত ২২ মার্চ ৮/ ইস্ট ও ওয়েস্ট, ৯ ও ১০ নং ক্যাম্পে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তা ছিল মূলত চিহ্নিত সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রিত। এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিকল্পিত। কারণ কোন এক স্থানে আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হত না বলে এ রোহিঙ্গাদের দাবি।
পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী ওয়ার্ড মেম্বার নুরুল আবসার চৌধুরী বলেন, সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরাই ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে শুনেছি। এধরণের আইনশৃংখলা পরিপন্থী ঘটনায় স্থানীয় লোকজন উদ্বিগ্ন।
উখিয়ার পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম, গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, একই সময়ে ৪ টি ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রহস্যাবৃত। বেশকিছু রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসঙ্গে কয়েকটি স্থানে আগুন ধরার কারণেই দ্রুত আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। ক্যাম্পগুলোর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে না আনা পর্যন্ত শৃংখলা ফিরে আসবে না বলে জানান তিনি। দুই সপ্তাহের বেশি সময় চলে গেলেও অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে তা অপ্রকাশিত। যদিও বলা হচ্ছে, এ ঘটনায় গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। এতে অগ্নিকাণ্ড রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।

দৈনিক আজাদী

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: