শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১১:০৩ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দৈনিক আলোকিত উখিয়ায় আপনাকে স্বাগতম

না ফেরা দেশে চলে গেলেন পেকুয়ার রাজাখালীর পীরে কামেল মাওলানা এলাহদাদ আলভী (রহ.)

  • সময় মঙ্গলবার, ৬ এপ্রিল, ২০২১
  • ১২৩ বার পড়া হয়েছে

১৯৯৪ সাল। নবী দিবস উপলক্ষে আমাদের মাদরাসায় তামাদ্দুনিক প্রতিযোগিতা। অন্যান্যের মতো আমিও বিষয় ভিত্তিক বক্তৃতা পর্বে নাম জমা দেই। এতে আশেপাশের বহু মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়; বিষয় ছিল ‘আদর্শ সমাজ সংস্কারক হযরত মুহাম্মদ (সা.)’। প্রতিযোগিতার দিন আমার নাম ঘোষণা হলে যথারীতি আমি গর্জিয়াস এক বক্তৃতা প্রদান করি। কিন্তু ভাগ্য খারাপ, বিকেলে বিজয়ীদের লিস্টে আমার নাম আসেনি। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন খোদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল। পরদিন যোহরের নামাযের পর প্রিন্সিপাল হুজুর সবাইকে বসতে বললেন। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন হামিদ, তুমি কই? দাঁড়াও। আমি ভয়ে ভয়ে দাঁড়ালে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কালকে তুমি বক্তৃতার জন্য পুরস্কার পাওনি? আমি বললাম, না, হুজুর পাইনি। তখন তিনি ক্রদ্ধ কন্ঠে বললেন, “বিচারক কে কে ছিল? কেন এই ছেলেকে পুরস্কার দেয়া হয়নি? আমি আমার রুম থেকে তার পুরো বক্তৃতা শুনেছি। তার চেয়ে ভাল বক্তব্য কেউ দেয়নি। আগামীকাল বাদ যোহর তাকে পুরস্কৃত করা হবে। ” এভাবে তিনি প্রত্যেক ছাত্রের পারফরমেন্স ও যোগ্যতার প্রতি প্রখর নজর রাখতেন । তিনি আর কেউ নন। তিনি পেকুয়া তথা কক্সবাজার জেলার অন্যতম প্রাচীন বিদ্যাপীঠ রাজাখালী বেশারতুল উলুম ফাযিল (ডিগ্রি) মাদরাসার সোনালী যুগের দীর্ঘকালীন প্রিন্সিপাল পীরে কামেল মাওলানা এলাহদাদ আলভী (রহ.)। গতকাল (০৪ এপ্রিল ২০২১) হুজুর দুনিয়াবী জিন্দেগীর সফর সমাপ্ত করেছেন। তিনি একই মাদরাসার প্রায় চার দশক ধরে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ আলিমে দ্বীন গড়ে তুলেন যারা বর্তমানে সমাজ ও দেশের সর্বস্তরে উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন। জন্ম ও পড়াশোনা মাওলানা এলাহদাদ আলভী (রহ.) ১৯৩৮সালে পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের পালাকাটা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আলহাজ্ব আলী মিঞা। ১৯৫০ সালে এলাকার জমিদার ও সমাজসেবক আলহাজ্ব মুহাম্মদ কবির চৌধুরী ও আলহাজ্ব আহমদ কবির চৌধুরী (বড় মিঞা ও ছোট মিঞা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজাখালী বেশারতুল উলুম মাদরাসায় প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি ঐতিহ্যবাহী পুঁইছড়ী ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা (১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত) হতে ফাযিল ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কর্মজীবনে চট্টগ্রাম শহরের প্রাচীতম দ্বীনি মারকায ওয়াজেদিয়া আলিয়া মাদরাসা হতে কামিল ডিগ্রি গ্রহণ করেন। কর্মজীবন মাওলানা এলাহদাদ আলভী (রহ.) কর্মজীবনের শুরুতে ঠুকঠাক ব্যবসায় জড়িত হলেও ১৯৭৪ সালে নিজের শিক্ষকদের অনুরোধে রাজাখালী বেশারতুল উলুম মাদরাসায় সহ-সুপার হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে আলিম ও ১৯৭৬ সালে ফাযিল জামাত অনুমোদন পেলে তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল পদে উন্নীত হন। ১৯৮৬ সাল অবধি ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে তৎকালে সাড়া জাগানো প্রিন্সিপাল মাওলানা আবদুর রহমানের সহযোগী হিসেবে মাদরাসায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড সম্পাদন করেন। ১৯৮৬ সালের পর কয়েক বছর তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন শেষে রিটায়ার্ড হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া তিনি তাঁর বাড়ির সন্নিকটস্থ আমিল্লা পাড়া জামে মসজিদে চার দশক ধরে অবৈতনিকভাবে খতীবের দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠন ও তরীকত মাওলানা এলাহদাদ আলভী (রহ.) ছিলেন তরীকতের নিবেদিতপ্রাণ দায়িত্বশীল। তিনি এলাকার বিভিন্ন সভা-মজলিশে সভাপতির আসন অলংকৃত করতেন। দক্ষিণ বাঁশখালীর বিশিষ্ট বুযুর্গ মাওলানা শাহ এলাহী বখশ ছোট হুজুর (১৯০১-১৯৯৪) ও মাওলানা শাহ শফিকুর রহমান বড় হুজুর (১৯০১-১৯৯৮) এর খলীফা ছিলেন। উল্লেখিত দুইজন আল্লাহর ওলি পুঁইছড়ী মাদরাসার হুজুরের উস্তাজও ছিলেন। তিনি ছোট হুজুরের শানে বেশ কিছু মর্সিয়া রচনা করেন। উল্লেখ্য, ছোট হুজুর ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিংশ শতকের সেরা পীর মাওলানা আবদুস সালাম আরকানী (রহ.) এর খলীফা, যিনি উপমহাদেশের মুজাদ্দেদিয়া তরীকার আধ্যাত্মিক গুরু আল্লামা হামেদ হাসান আলভী আজমগড়ী (রহ.) এর সিনিয়র খলীফা ছিলেন। সম্ভবত এ পরদাদা পীরের নামের নিসবতে মাওলানা এলাহদাদ (রহ.) ‘আলভী’ লক্বব ধারণ করেন। তিনি আজীবন এ তরীকতের নীতিমালা অনুসারে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ আনজাম দিয়েছেন। তাঁর বুদ্ধি-পরামর্শে একাধিক মাদরাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাদরাসায় শিক্ষকতা কালে তিনি জমিয়তুল মোদরেসীন পেকুয়া শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বভাব-চরিত্র: মাওলানা এলাহদাদ আলভী (রহ.) ছিলেন ইসলামী শরীয়তের একজন বিদগ্ধ আলিম। আরবি-ফার্সি- উর্দু ও বাংলা ভাষায় তার সমান দক্ষতা ছিল। প্রাঞ্জল শব্দ চয়ন ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য উপস্থাপনে তিনি সবার কাছে উস্তাযুল আসাতেযা হিসেবে সমাদৃত হতেন। একজন জাত শিক্ষক হিসেবে মাদরাসার একাডেমিক উন্নয়নে সবসময় পেরেশান থাকতেন। ছাত্রদের মাঝে পড়াশোনায় উৎসাহ- উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতেন। প্রশাসনিকভাবে কঠোর মেজাজের হলেও আত্মীয়তায় সম্পর্কে ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী। একবার আমি হুজুরকে ‘নানা’ পরিচয় দিলে তিনি বলে উঠলেন, কেবল তো ‘নানা’ নয় তোমার বাবা আমার তালত ভাইও হয়। আমাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যেমনি শাসন করতেন তেমনি আমার সাহিত্য চর্চায় নিজেকে গর্বিত ভাবতেন। পারিবারিক জীবনে তিনি স্থানীয় মাস্টার আবুল হোসাইন সিকদারের বোনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে হুজুরের ছেলেমেয়ে সবাই শিক্ষিত ও উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ। মেঝ ছেলে মাওলানা আলী জাফর সাদেক (দাখিল-কামিল বোর্ড স্ট্যান্ড) চট্টগ্রাম শহরস্থ বাওয়া স্কুল এন্ড কলেজে ইসলামিয়াতের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। ইন্তেকাল: মাওলানা এলাহদাদ আলভী (রহ.) বার্ধক্যজনিত রোগে গতকাল ৪ এপ্রিল ২০২১ নিজ বাড়ীতে ইন্তেকাল করেন এবং জানাযা শেষে নিজেদের পারিবারিক গোরস্থানে আজ বিকালে সমাহিত হন। আয় আল্লাহ পরওয়ারদেগার ! ইলম ও আমলের অপূর্ব সমন্বয় আমার হুজুরের সকল গুনাহ মাফ করে দিন। হুজুরকে জান্নাতের বাগিচায় মেহমান হিসেবে বরণ করে নিন,আমীন।

লেখক: রায়হান আজাদ সহকারি অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কক্সাবাজার এবং এম.ফিল গবেষ

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: