শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর ২০২১, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দৈনিক আলোকিত উখিয়ায় আপনাকে স্বাগতম

শহরের মূর্তিমান আতঙ্ক আশু আলী বাহিনীর উত্থান ও ভয়ংকর অপরাধ জগতের সচিত্র

  • সময় রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৩৪৫ বার পড়া হয়েছে

কক্সবাজার শহরের মূর্তিমান আতঙ্ক কুখ্যাত সন্ত্রাসী একাধিক হত্যা, ছিনতাই সহ ডজনাধিক মামলার পলাতক আসামি আশরাফ আলী প্রকাশ আশু আলী বাহিনীর প্রধান আশরাফ আলী প্রকাশ আশু আলীর মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠার পেছনের কাহিনী ও নানা অপরাধী কর্মকাণ্ডের সচিত্র প্রতিবেদন।

কে এই আশরাফ আলী প্রকাশ আশু আলী?

আশরাফ আলী প্রকাশ আশু আলীর পিতা কক্সবাজার পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের সিকদার পাড়ার মৃত ইউছুপ আলীর ছেলে জাফর আলম। জাফর আলম সিকদার পাড়ার পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত বসত বাড়ি বিক্রি করে পার্শ্ববর্তী চৌধুরী পাড়াস্থ শশুর মৃত কাদের হোছনের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পরে জাফর আলমের স্ত্রীর ভাইয়েরা নিজেদের পৈত্রিক বসতবাড়ি বিক্রি করে একেক জন একেক জায়গায় চলে যাওয়ার ফলে জাফর আলম সাব মেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনের সামনের তৎকালীন ঝিলংজা বিট (ফরেস্ট) অফিসের পেছনে পিএফ জায়গায় বসত বাড়ি গড়ে তুলে।

জাফর আলম চৌধুরী পাড়ার শশুর বাড়িতে আশ্রিত থাকা কালীন সময় থেকে ফরেস্ট অফিসের পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা সিএনজি (ট্যাক্সি) চালক জুনু ড্রাইভারের ছেলে আমির খানের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। আমির খান সাহিত্যিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র ছিল। বাবা সিএনজি চালক হওয়ায় আমির খানের পরিবারে অভাব অনটন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। আমির খান নিজের লেখা পড়া এবং অন্যান্য খরচ নির্বাহের জন্য এলাকায় টিউশনি করা শুরু করে। এই সময়ের মধ্যে দক্ষিণ সাহিত্যিকা পল্লী এলাকায় দুজন ইয়াবা সম্রাজ্ঞীর আবির্ভাব ঘটে।

এক সময়ের মেধাবী ছাত্র আমির খান পার্শ্ববর্তী ইয়াবা সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে সখের বসে প্রথম ইয়াবা সংগ্রহ করে বন্ধু বান্ধবদের সাথে নিয়ে সেবন করা শুরু করে। এক পর্যায়ে আমির খান সহ তার কয়েক বন্ধু বান্ধব ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে। তার পর থেকে আমির খান নিজের নেশার টাকা যোগাড় করতে প্রথমে ছোট খাটো ছিনতাই চুরি করা শুরু করে। এক সময় আমির খান ছিনতাই করতে গিয়ে এলাকা বাসীর হাতে ধরা পড়লে। এলাকাবাসী প্রথমে মারধর করে ছেড়ে দেয় ভাল হয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ইয়াবা আসক্ত আমির খান নিজে ইয়াবা ট্যাবলেটের টাকা যোগাড় করতে এলাকার বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে একটি ছিনতাইকারী গ্রুপ গঠন করে।

এই ছিনতাইকারী গ্রুপের প্রধান ছিল আমির খান। সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিল আজকের আশরাফ আলী প্রকাশ আশু আলী। আশু আলীর বাল্য বন্ধু সরওয়ার ছিল আমির খান গ্রুপের থার্ড ইন কমান্ড। এই গ্রুপ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার পর নিজ এলাকা এবং এলাকার বাইরে বিশেষ করে, বাস টার্মিনাল, বিএডিসি কৃষি খামারের সামনের সড়কে, বিজিবি ক্যাম্প, আলির জাঁহাল আর্মি ক্যাম্পের সামনে, সিটি কলেজ গেইট, পশ্চিম লার পাড়া, উত্তরণ হাউজিং এর সামনের সড়কে, নতুন জেল গেইট, আদর্শ গ্রাম, বড় ছরা দরিয়া নগর, সার্কিট হাউস এলাকা সহ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ছিনতাই করা শুরু করে।

বিভিন্ন সময় ছিনতাই করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে আটক হয়ে গণধোলাই দেওয়ার পর থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। থানা পুলিশ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় জেলার চিহ্নিত নাম করা ছিনতাইকারী এবং চোর ডাকাতদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে আমির খান ও কারাগারে অন্তরীণ থাকা তার গ্রুপের সদস্যরা। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে জামিনে মুক্তি লাভের পর নতুন ভাবে আরো বেপরোয়া হয়ে ছিনতাই ডাকাতি শুরু করে এই আমির খান বাহিনী। জেলার বিভিন্ন অপরাধীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলার পর এই বাহিনীর প্রভাব জেলাব্যাপী বিস্তৃত হতে থাকে।

২০১৮/২০১৯ ইংরেজির সনের দিকে কক্সবাজার জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী আমির খানের কৃতকর্মের ফলে জেলা পুলিশের তালিকায় স্থান করে নেয়। হিসাবে আমির খান পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়। পরবর্তীতে আমির খানের সেকেন্ড ইন কমান্ড আশু আলী কিছুদিন এলাকার বাইরে চলে যায় । বিশেষ সূত্রে জানা যায় আমির খান পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হবার পর আশু আলী ছদ্মবেশে তাবলীগ জামায়াতের সঙ্গে চিল্লাতে গিয়ে আত্মগোপন করে কিছুদিন নিরব থাকে। পরবর্তী সময়ে তাবলীগ জামায়াত থেকে ফিরে আসার পরে এই গ্রুপের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আবার ছিনতাই করা শুরু করে। তখন আশরাফ আলী প্রকাশ আশু আলী হয়ে যায় দলের প্রধান আর তার বাল্য বন্ধু সরওয়ার হয়ে যায় গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড।

এর পর থেকে আশরাফ আলী প্রকাশ আশু আলী হয়ে যায় শহরের এক দুর্ধর্ষ বাহিনীর দুর্ধর্ষ নেতা। আশু আলীর সাথে শহরের, এবিসি ঘোনার ইসমাইল বাহিনী ও আবছার বাহিনী , মাটিয়া তলী- সমিতি বাজার এলাকার বার্মাইয়া নুর জোহার বাহিনী, উত্তর ও দক্ষিণ পল্লান কাটা এলাকার বার্মাইয়া হাবিব উল্লাহ বাহিনী, নতুন জেলগেট এলাকার নুরুল আলম বাহিনী, পাহাড় তলী এলাকার সিফাত বাহিনী, টেকনাফ পাহাড় এলাকার সালমান শাহ বাহিনী, সিকদার পাড়া এলাকার সোলেমান প্রকাশ সালমান শাহ বাহিনীর সাথে আশু আলী বাহিনী অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলে। এই বাহিনী বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ছিনতাই সহ নানা অপরাধ সংঘটিত করে নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে শহরের পাহাড়ী এলাকা পাহাড় তলী, আবু উকিলের ঘোনা, মাটিয়া তলী, পল্লান কাটা, নতুন জেল খানা ও জেলা পুলিশ লাইনের দক্ষিণে পাহাড়ি এলাকাতে আত্মগোপনে চলে যেতো।

এর মাঝে নতুন জেলগেট এলাকার নুরুল আলম (সম্পর্কে আশু আলীর মামা হয়) বাহিনীর নুরুল আলম, এবিসি ঘোনা এলাকার ইসমাইল বাহিনীর ইসমাইল, পল্লান কাটার বার্মাইয়া হাবিব উল্লাহ বাহিনীর হাবিব উল্লাহ, পাহাড় তলী এলাকার সিফাত বাহিনীর সিফাত পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়। পল্লান কাটার আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নুর জোহার বাহিনী ও হাবিব উল্লাহ বাহিনী, আমির খান বাহিনী মিলে দক্ষিণ রুমালিয়ার ছরা সিকদার বাজার এলাকার ওয়াহিদুর ছেলে আবদুল্লাহকে কুপিয়ে হত্যা করে। দিন দুপুরে ৪০/৫০ জনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে নুর জোহার প্রকাশ মোহাম্মদ জোহার, হাবিব উল্লাহ বাহিনী, আশু আলী বাহিনী, সালমান শাহ বাহিনী, আবছার বাহিনীর সমন্বয়ে নুর জোহার প্রকাশ মোহাম্মদ জোহারের নেতৃত্বে সমিতি বাজার এলাকার জালাল আহমদের বাড়িতে হামলা করে ঘর ভাঙচুর ও বেড়াতে আসা জালাল আহমদের মেয়ে জামাই আবদুস শুক্কুরকে গুলি করে গুরুতর জখম করে।

এই বাহিনী গুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জায়গা ক্রয় বিক্রয়, ঘর বাঁধতে গেলে এই বাহিনীকে নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা প্রদান করতে হয়। চাঁদা না পেলে এই বাহিনী স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর নানা ধরনের অন্যায় অত্যাচার করতে থাকে। এই সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা একজোট হয়ে সমিতি বাজার এলাকায় বার্মাইয়া নুর জোহার প্রকাশ মোহাম্মদ জোহারকে একা পেয়ে হামলা করে দা ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।

পুলিশের বন্দুক যুদ্ধ স্থানীয়দের গণ হামলায় বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসী বাহিনীর নেতা সদস্যরা নিহত বা কারাগারে অন্তরীণ থাকলে সেই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সেকেন্ড ইন কমান্ড যে থাকে সেই দলের দায়িত্ব গ্রহন করে। শহরের চিহ্নিত সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্বে থাকা দল নেতাদের সমন্বয় করে আশু আলী গড়ে তুলে এক দুর্ধর্ষ বাহিনী। যে বাহিনীর সদস্য কক্সবাজার জেলা শহরের বাইরে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যও আশু আলী বাহিনীর সদস্য হিসাবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা শহরে ছিনতাই ডাকাতি করারও তথ্য রয়েছে।

যার ফলে শহরের দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী আশরফ আলী প্রকাশ আশু আলী একের পর এক হত্যা, ছিনতাই থেকে শুরু করে নানা ধরনের জঘন্য অপরাধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত করতে থাকে। পিতা জাফর আলম ও বড় মামা মমতাজুল হক, মেঝ মামা মনিরুল হক এবং ছোট মামা মাহমুদুল হক ও আশু আলীর বড় ভাই ইঞ্জিন মেকানিক। সেও তার ছোট ভাইকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয় বলে অনেক ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এক কথায় আশু আলী পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন জনের সহযোগিতা পেয়ে কক্সবাজার শহরের এক মূর্তিমান আতঙ্কে পরিনত হয়ে যায়।

নিউজের সকল তথ্য স্থানীয় সূত্র এবং ভোক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে করা।

গত ৩০ জানুয়ারী নুরুল আমিন প্রকাশ সাইফুল ইসলাম প্রকাশ সাফু কে ছুরিকাঘাত এবং গুলি করে হত্যা করে আশু আলী বাহিনীর প্রধান আশু আলী। পুলিশ বিভিন্ন হত্যা ও ছিনতাই মামলার পলাতক আসামি আশু আলীকে আটক করতে সম্ভাব্য একাধিক জায়গা অভিযান চালিয়েও আটক করতে পারেনি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আনোয়ার জানিয়েছেন, আশু আলীকে গ্রেফতার করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলমান রয়েছে। অতিসত্বর পুলিশের হাতে আটক হবে।
শহরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় টহল জোরদার করায় সন্ত্রাসী গ্রুপ গুলো পার্শ্ববর্তী এলাকায় সরে গেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

(অসমাপ্ত)
সাফু খুন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় আশু আলী বাহিনীর হাতে আরো যারা খুন হয়েছে, এসব বিষয়ে আরও সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: