শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০১:৫১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দৈনিক আলোকিত উখিয়ায় আপনাকে স্বাগতম

এক সময়ে জাল ঠুনা ও রিকশা গেরেজে কাজ করা কালাম ও মনজুর এখন কোটিপতি !

  • সময় মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৬৭ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি;
এক সময়ের ফিশিং বোটের জাল ঠুনা রিকশা শ্রমিক কালাম ও তার ভাই মনজুর বর্তমানে কোটিপতি। কালাম ও মনজুর এখন তিন লাখ টাকা মূল্যের কাছাকাছি দামের মটর সাইকেল নিয়ে চলাচল করেন। এক সময় যাদের সংসারে অভাব অনটন নিত্যনৈমিত্য ব্যপার ছিল সেই অভাবের সংসারে এমন কোন জাদুর কাঠির গুণে বছর দুয়েক সময়ের মধ্যে কোটি কোটি টাকার সহায় সম্পদের মালিক বনে গেছেন ? এমন প্রশ্ন এলাকার সাধারণ মানুষের।

সূত্রে প্রকাশ মোঃ কালাম ও তার ভাই মনজুর আজ থেকে কয়েক বছর আগে টেকনাফ উপজেলার হোয়াক্যং ইউনিয়নের বালুখালী কোনা পাড়া হোয়াইক্যং( বিজিবি চেকপোস্টের পূর্ব পাশের গ্রাম) এর আবদুল হাকিমের ছেলে মোঃ কালাম ও মনজুর জীবন ও জীবিকার তাগিদে হোয়াইক্যং থেকে কক্সবাজার আলীর জাঁহাল স্টেশনে চলে আসেন। তখন তারা দুই ভাই জীবন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য শহরের বিভিন্ন বহদ্দারের ফিশিং বোটের ছেঁড়া জাল ঠুনার কাজ, রিকশা চালা এবং রিকশা গেরেজে কাজ করা ও ব্যাটারি চালিত টমটমগাড়ি চালিয়ে নিজেদের সাংসারিক খরচ চালাতেন। গত দুয়েক বছর আগেও এরা উল্লেখিত পেশায় নিয়োজিত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। মাত্র দুয়েক বছর সময়ে তারা হয়ে যায় কোটিপতি।

বর্তমানে কালাম গোদার পাড়ার আপন নিবাস নামক একটি ভাড়া কলোনিতে ভাড়ায় বসবাস করছে।

এত অল্প সময়ে কি করে তারা এত বিত্তবৈভবের মালিক বনে গেছে এই নিয়ে স্থানীয় জনমনে প্রবল সন্দেহ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সচেতন মহলের দেওয়া সূত্র ধরে দৈনিক আলোকিত উখিয়ার ক্রাইম নিউজ এডিটরের নেতৃত্বে অন্যান্য স্থানীয় এবং জাতীয় সংবাদ পত্রের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধানী টিম গঠন করে দীর্ঘ এক মাসের কাছাকাছি সময় ধরে এই দুই ভাইয়ের কোটিপতি হওয়ার পেছনের কারণ পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান করেন। এই দু-ভাইয়ের বর্তমান এবং পেছনের অবস্থা অনুসন্ধান করতে গিয়ে এদের বিরুদ্ধে নানা চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, কালাম, মনজুর ও আলীর জাঁহালস্থ সেবা কমিউনিকেশনের মালিক মহেশখালী শাপলা পুর এলাকার সাইফুল ওরফে বিকাশ সাইফুলেরা কক্সবাজার, টেকনাফ ও মহেশখালী কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী ইয়াবা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। বর্তমান অনুসন্ধান পর্যন্ত এই সিন্ডিকেটের মূলে থাকা তিন জনের নাম জানা গেছে। কালাম, মনজুর ও বিকাশ সাইফুল এই তিন জনেই হল সিন্ডিকেট সদস্য । এদের মধ্যে কালামের তত্বাবধানে মূলত গোদার পাড়া আলীর জাঁহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকার বিশ্বস্ত কিছু যুবকদের দিয়ে ইয়াবা খালাস পাচার করে থাকে। যারা এই অবৈধ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তারা কালামের সাথে চুক্তি করে নির্দিষ্ট অংকের টাকার বিনিময়ে ইয়াবার চালান গ্রহন, খালাস, পাচার ও বহন করার কাজ সম্পন্ন করে থাকে। অতীতে এই সিন্ডিকেটের হয়ে ইয়াবা সংশ্লিষ্ট কাজ করা একজন সাবেক সদস্যের সূত্রে এই খবর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বছর দুয়েক সময়ের মধ্যে কালাম ও তার ভাই যে সমস্ত সম্পদের মালিক হয়েছে আমাদের অনুসন্ধানী টিম যে সম্পদের তথ্য পেয়েছে তা হল, বর্তমানে এই দুই ভাইয়ের রয়েছে ২০টি ব্যাটারী চালিত টমটম গাড়ি এবং দুটি টমটম গাড়ি রাখার গ্যারেজ ও চার্জিং স্টেশনসহ টমটম গ্যারেজ। ১টি গ্যারেজ আলীর জাঁহালস্থ নুরুল আমিন সিকদারের জায়গায় আরেকটি গ্যারেজ বাস টার্মিনাল এলাকায়। টমটম গাড়ি মেরামত ও তৈরির একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ রয়েছে। এই ওয়ার্কশপটিতে ৩ জনের অংশীদারত্ব রয়েছে বলে জানা যায়। এই ওয়ার্কশপটি সাইফুল কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীতে আর্মি ক্যাম্পের সামনের উর্মী রাইস মিলের মার্কেটে। এছাড়াও কালাম ও মনজুর ব্যক্তিগত ভাবে উচ্চ মূল্যের মটর সাইকেল ব্যবহার করে। আবার একটি মটর সাইকেল বেশীদিন ব্যবহার করেননা। ব্যবহৃত মটর সাইকেল একটু পুরাতন হলে বিক্রি করে দিয়ে আবার নতুন মডেলের দামী আরেকটি মটর সাইকেল ক্রয় করে ব্যবহার করেন এমনটাই জানিয়েছেন স্থানীয় সূত্র।

এই সিন্ডিকেট তাদের নিজস্ব ইয়াবা খালাসের পাশাপাশি মহেশখালী উপজেলা ভিত্তিক একাধিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের আমদানি করা বড় বড় ইয়াবার চালানও চুক্তির মাধ্যমে খালাস করার দায়িত্ব নেন বলে জানা যায়। মহেশখালী সিন্ডিকেটের ইয়াবা খালাসের চুক্তি গুলো মূলত বিকাশ সাইফুলের মধ্যস্থতায় করা হয় এমনটাই জানা গেছে। এই সিন্ডিকেটের ইয়াবা খালাসের নিরাপদ স্থান বাঁকখালী নদীর কূলবর্তী পাড়া ও গ্রাম এলাকা সমুহ। বিশেষ করে খুরুশকূল ব্রীজের উজানে গোদার পাড়া, এসএমনপাড়া, ছনখোলা ঘাট এলাকাতেই বড় বড় ইয়াবার চালান খালাস করার খবর রয়েছে । মাঝে মাঝে আইনশৃংখলা রক্ষাবাহিনির খুরুশকূল ব্রীজের পার্শ্ববর্তী বাঁকখালী নদী থেকে বড় বড় ইয়াবার চালান আটক করা হয়েছিল।

আলীর জাঁহাল এসএম পাড়া সড়কে মহেশখালীর চিহ্নিত মানব পাচারকারী, ইয়াবা কারবারি, ভূমিদস্যুতা সহ ডজন খানেক মামলার পলাতক আসামি ফোরকানের ভাই হল বিকাশ সাইফুল। বিকাশ সাইফুলের রয়েছে সেবা টেলিকম নামে একটি বিকাশ এজেন্টের দোকান । সিন্ডিকেট সদস্য বিকাশ সাইফুল তার সেই বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের ইয়াবা কারবারের সমস্ত টাকার লেনদেন করেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। কালাম,মনজুর ও বিকাশ সাইফুল এই তিন জনেই হল এই সিন্ডিকেটের মূল সদস্য।

পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের এসএম পাড়ার বাসিন্দা আবদুল মাবুদ নামের একজন লোকের গোদার পাড়া এলাকায় জায়গা আছে। কিছুদিন আগে সেই জায়গা থেকে ৮ শতাংশ জায়গা মোঃ কালাম ৩০ লাখ টাকা দামে ক্রয় করেছেন । কালামের ক্রয়কৃত জায়গাটি গোদার পাড়াস্থ হোটেল দেলোয়ার প্যারাডাইজের মালিক দেলোয়ারের ক্রয়কৃত জায়গার পাশেই । ৩০ লাখ টাকা দিয়ে চার গন্ডা বা ৮ শতক জায়গা ক্রয় করলে মৌজা রেইট হিসাবে রেজিস্ট্রি খরচসহ হিসাব করে দেখা যায় জায়গা ক্রয় ও রেজিস্ট্রি খরচসহ ক্রেতা কালামের অর্ধকোটি টাকা মতো খরচ হবে বলে অবিজ্ঞ জনেরা মত প্রকাশ করেন ।

এই দুই ভাইয়ের আরো যে সহায় সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়, তা হল, টেকনাফ কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে ভাড়ায় দেওয়া দুটি সূজুকি কার গাড়ি, ডিজেল চালিত যাত্রীবাহী ৪টি মাহিন্দ্রা গাড়ি, লাইসেন্স সহ ২০টি ব্যাটারী চালিত টমটমগাড়ি।

একটি টমটম গাড়ির লাইসেন্সের বর্তমান বাজার মূল্য ২ লাখ টাকা। লাইসেন্স ছাড়া একটি টমটম গাড়ির মূল্য ১লাখ ৮০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে লাইসেন্স সহ ২০টি টমটমের মূল্য দাঁড়ায় ৭৬ লাখ টাকা। দুটি টমটম গ্যারেজ নির্মাণ, জায়গার মালিককে দেওয়া জামানত, টমটম চার্জিং সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ সংযোগ বাবদ খরচ সহ কত টাকা খরচ হতে পারে এটারও হিসাব কষা প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান সচেতন মহল।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত কালামকে ফোন করে আমাদের প্রতিনিধি তার বক্তব্য জানতে চাইলে কালাম জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা এবং তার গাড়ীঘোড়া বলতে কিছু নেই বলে দাবী করেন। তিনি আরো জানান, ২০০২ ইংরেজিতে সে হোয়াইক্যং থেকে কক্সবাজার আসেন। কক্সবাজার এসেই প্রথম প্রথম রিকশার গেরেজে কাজ করতেন। পরবর্তীতে যখন কক্সবাজারে ব্যাটারী চালিত টমটম আসে তখন টমটমের কাজ শিখে আলীর জাঁহাল আর্মি ক্যাম্পের সামনে উর্মী রাইস মিলের পাশে মোস্তফা কন্ট্রাক্টর থেকে একটি দোকান নিয়ে টমটম মেরামত ও বাঁধার কাজ করে আসছেন বলে আমাদের প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন। বর্তমানে সে গোদার পাড়ায় একটি ভাড়া বাসাতে ২ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে বসবাস করছে বলে জানিয়েছেন। এখনো পর্যন্ত সে একটি খাস জায়গারও মালিক হতে পারেননি বলে আমাদের প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন।

আমাদের অনুসন্ধানী টিম দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান করে যে সমস্ত তথ্য বিশেষ করে উপর্যুক্ত তার ব্যবহৃত মটর সাইকেল ও তার নামের বিভিন্ন ব্যবসায়ীক গাড়ি, ক্রয় করা জায়গা, অতীতে জাল ঠুনা কাজ করা সহ অনেক কিছুই কালাম অস্বীকার করেছে। শুধুমাত্র ওয়ার্কশপের কথা এবং ভাড়া বাসায় থাকে সেই কথাই স্বীকার করেছেন।

আমাদের অনুসন্ধানী টিম সরজমিন অনুসন্ধান করে যে সমস্ত তথ্য পেয়েছে সে গুলো অস্বীকার করা মানে প্রাপ্ত তথ্য গুলো মিথ্যা। কালামের দাবী আমাদের প্রাপ্ত তথ্য মিথ্যা । তাহলে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল কালামের বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা। আমরা যদি আমাদের প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে আমাদের অনুসন্ধানী টিমই মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত হবে এটাই হল বাস্তবতা। আমাদের অনুসন্ধানী টিম চ্যালেন্জ গ্রহন করেছেন যে, কালাম মিথ্যা বলেছেন। অনুসন্ধানী টিমের প্রাপ্ত তথ্য মিথ্যা নয়। কে সত্য বলছে কালাম নাকি দৈনিক আলোকিত উখিয়ার অনুসন্ধনী টিম? পাঠক সমাজ জানতে চাইলে নিয়মিত চোখ রাখুন দৈনিক আলোকিত উখিয়া সংবাদপত্রে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: