গাফিলতিতে’ ৬ বছরেও হয়নি এক্সমিলিটারি রোডের নির্মাণ কাজ

গাফিলতিতে’ ৬ বছরেও হয়নি এক্সমিলিটারি রোডের নির্মাণ কাজ

আলোকিত রিপোর্ট:

প্রকল্পের 95 শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
ইঞ্জিনিয়ারদের ঘুষের টাকা জোগান দিতে না পেরে গত এক বছর আগে প্রকল্প স্যালেন্ডার।
ইঞ্জিনিয়াররা মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার কথা বলেন ঠিকাদার।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা ঘুষ নিবে না বলে লিখিত দিলে কাজ শেষ করে দেয়ার আশ্বাস ঠিকাদারের।

কক্সবাজার সদর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের নাম এক্স মিলিটারি সড়ক। এই সড়কটি তৎকালীন বৃটিশ সরকার নির্মাণ করেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংক আইডিএ এর অর্থায়নে এই সড়কটি পাকা করণের কাজ শুরু করা হয় ২০১৪ সালে। কাজ চলাকালীন অবস্থায় ওই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ নানান অযুহাতে অটো বন্ধ করে দেন ঠিকাদার। এর এক/দেড় বছর পর প্রকল্পটি পুনঃবার রি-টেন্ডার করে ব্যয় বাড়ানোর পর পুনরায় কাজ শুরুর মাত্র ক’দিন পরেই প্রকল্পের কাজ শেষ না করে নির্মাণ সামগ্রী গুটিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায় ঠিকাদার। প্রকল্প দায়িত্বরত এলজিইডির অসাধু কর্মকর্তা”র ঘুষ দুর্নীতি ও ঠিকাদারের গাফিলতির জন্য এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন ইন্টারন্যাশনালের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেছে,
এটি একটি ব্যতিক্রম প্রকল্প, অন্যান্য প্রকল্পের মত নয়। এ প্রকল্প কাজের টাকা উত্তোলন করতে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কক্সবাজারের কয়েকটি অফিসসহ চট্টগ্রাম কুমিল্লা হয়ে ঢাকা থেকে বিল পাস করে নিতে হয়। এসময় ইঞ্জিনিয়ারদের মোটা অংকের ঘুষের টাকা দিতে হয়। কাজ আর বিল ও ঘুষের টাকার হিসাব করে আয় ব্যয় হিসাব করলে অনেক টাকা ক্ষতি হচ্ছে তাদের। আর এই রোডে ৭০-৮০ পার্সেন্ট কাজ শেষ হয়েছে। অতপর উক্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে নাকানি-চুবানির শেষ নেই। অন্যদিকে একাধিক অফিস ঘুরে কাজের বিল উত্তোলন করতে ইঞ্জিনিয়ারদেরকে মোটা অংকের ঘুষের টাকা না দিলে বছরের পর বছর বিল পাওয়া যায় না। এমনকি বিল পেতে ৫ টাকার পিছনে তাদের ১৫ টাকা ব্যয় করতে হয়। শেষমেশ নিজেদের ক্ষতি হলেও ঘাটে ঘাটে হয়রানি ও দুর্ভোগের কথা চিন্তা করেই গত এক বছর আগে এ প্রকল্পের কাজ করবে না বলে সারেন্ডার করেছে তারা। এরপরও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা ঘুষ দাবি না করলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাকি কাজ করে দিতে আগ্রহ দেখা গেছে।

২০১৬ সালের ৩ মার্চ কাজ শেষের মেয়াদ ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) অধীনে কর্তৃপক্ষের ‘গাফিলতির’ কারণে ৬ বছরেও
শেষ হয়নি “রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট” (আরটিআইপি-২) প্রকল্পের কাজ। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব ব্যাংক আইডিএ এর অর্থায়নে নির্মিত সদর উপজেলার পিএমখালী ইউপি হইতে খুরুশকুল ইউপি অফিস (এক্স মিলিটারি রোড়) চেইনেজ ১+২৫০-৫+৪৫০ কিলোমিটার
গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নির্মাণ কাজ।

২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে রোডটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আর ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কাজ শেষের মেয়াদ ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) অধীনে দেড় বছরের কাজ বিগত ছয় বছরেও সম্পন্ন করা যায়নি। এতে উপজেলার ২টি ইউনিয়নের অন্তত ৪০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হচ্ছে না।এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গাফিলতির জন্য এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে,এই এক্স মিলিটারি রাস্তার পুর্বে পিএমখালী ইউনিয়ন এবং পশ্চিমে খুরুশকুল ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে রাস্তাটি হচ্ছে।
চাকমারকুল – মনতারগোদা (পিএমখালী) রোড (চেই:২+৮০০-৪-৭৫০ কিমি:) রামু উপজেলা। ঈদগাঁও ডিসি – গোমাতলী বাজার ভাইয়া পোকখালী ইউপি (চেই:৮+৮৭০-১০+৭৫০কিমি:) সহ পিএমখালী ইউপি-খুরুশকুল ইউপি অফিস (এক্স মিলিটারি রোড়) (চেইনেজ ১+২৫০-৫+৪৫০ কিমি:) এ প্রকল্পের জন্য প্রথম বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৭ কোটি, ১৬ লাখ ৩ হাজার টাকা।

একটি সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উক্ত প্রকল্প সমূহের কাজ পাওয়ার পর প্রথম কাজ শুরু করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি। ১/২ বছর পর প্রকল্পের লস দেখিয়ে নানান কারসাজি করে উক্ত প্রকল্পটি রি-টেন্ডার এর মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে পুনরায় কাজ শুরু করে ঠিকাদার। এবারও ২/৩ মাসের মধ্যে কিছু জায়গায় সিসি ঢালাইয়ের কাজ করে স্থায়ীভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় ঠিকাদার।

সরেজমিনে রোডটিতে জনশ্রমিক ও কোন নির্মাণ সামগ্রী দেখা/পাওয়া যায়নি। কিছু কিছু স্থানে সিসি ঢালাইয়ের কাজ করেছে। কোথাও উভয় পাশের ড্রেনের কাজ করা হয়। আবার কোন স্থানে রাস্তা ও ড্রেনের কোন কাজ করা হয়নি। বিগত বছরগুলোতে যে কাজ করা হয়েছিল তাও ভারী যানবাহন চলাচলে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়ে যান চলাচলে মানুষের দুর্ভোগ চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রোডের অধিকাংশ কাজ এখনো বাকি পড়ে আছে।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, এতোবড় প্রকল্পের আওতায় রাস্তাটি নির্মাণ হচ্ছে, অথচ শুরু থেকেই কাজ যেন নিষ্প্রাণ। মাঝে তিন-চার বছর একদমই কাজ হয়নি। এরপর একটু হয়ে আবার অনির্দিষ্টভাবে বন্ধ গেছে। পথে-ঘাটে কিছু নির্মাণ সামগ্রী ছিল তাও নিয়ে যান ঠিকাদার। এনিয়ে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট মহলে জানিয়ে কোনো লাভ হয়নি। এই অবস্থায় এলাকার অন্তত এক লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছে।

স্থানীয়রা জানান, রাস্তাটি নির্মাণ হলে উপজেলার ২টি ইউনিয়নের অন্তত ৪০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ উপকৃত হবে। উপজেলার সর্ববৃহৎ ৫ টি বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত সময়ে বাজারজাত করতে পারবে। এলাকার সাধারণ মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে স্বপ্নের এই রাস্তা নির্মাণ শুরু করেছে এলজিইডি বিভাগ। ওই রাস্তার ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিম পাশে রয়েছে সদর উপজেলা, লিংক রোড, বাংলাবাজার বৃহৎ বাণিজ্যিক বাজার। আর এ রাস্তার ১ কিলোমিটার পশ্চিম দক্ষিণে খুরুশকুল টাইমবাজার। উপজেলার সবচেয়ে বড় বাজার বাংলাবাজার, খরুলিয়, রামু’র ফকিরা হাট অবস্থিত। দীর্ঘদিনের পুরাতন এই হাটে আসার জন্য দুই ইউনিয়নের মানুষকে রাস্তার অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

ছনখোলা গ্রামের বাসিন্দা পিএমখালী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কেফায়েত উল্লাহ জানান, দুই ইউনিয়ন জনবহুল এলাকা, বলতে গেলে বিশাল গ্রাম। এর মধ্যবর্তী কোন সংযোগ সড়ক না হওয়ায় দীর্ঘদিন মানুষকে ভোগাচ্ছে। গ্রামীণ প্রত্যন্ত এই এলাকার মানুষকে নিজেদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয় ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। এছাড়া রাস্তাটি চালু হলে প্রত্যন্ত এলাকার ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগীসহ সবারই দুর্ভোগ লাঘব হবে।

খুরুশকুল টাইমবাজারের ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন, তারা প্রতিনিয়ত বাংলাবাজার, রামু , লিংক রোড থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে তাদের হাটে যান। কিন্তু মধ্যবর্তী ২ ইউনিয়নে সংযোগ সড়ক না থাকায় তাদেরকে ১০-১৩ কিলোমিটার পথ ঘুরে কক্সবাজার হয়ে বাজার যেতে হয়। এতে তাদের পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যায়। দ্রুত উক্ত রাস্তার কাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছে উপজেলার ব্যবসায়ীরা।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন ইন্টারন্যাশনাল এর কর্ণধার আতিকুল ইসলামের মুঠোফোনে এই প্রকল্পের কাজ শেষ না করার ব্যাপারে জানতে চাইলে সে বলেন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে নানান জটিলতা ও দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ পর্যন্ত প্রকল্পটির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এ পর্যন্ত কাজ শেষ করতে সে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই ব্যতিক্রমী প্রকল্পের কাজের বিল কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-কুমিল্লা হয়ে ঢাকা থেকে বিল পাস করিয়ে আনতে ঘাটে ঘাটে প্রত্যেক অফিসে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। যার আয়-ব্যয় হিসাব করলে অনেক টাকা লস থাকে। তাই গত এক বছর আগে কাজ করবে না বলে এলজিইডির কাছে সারেন্ডার করেন। এরপরেও প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা ঘুষ নিবেন না বলে অঙ্গীকার করলে সে উক্ত প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করে দিবেন বলে প্রতিবেদককে আশ্বস্ত করেন।

পিএমখালী-খুরুশকুল এক্স মিলিটারি প্রকল্পের তদন্তকারী কর্মকর্তার মুঠোফোনে (০১৭১১৩৬১১৫৭) যোগাযোগ করলে সে এ প্রকল্পের বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

আবুল কালাম আজাদ (কমিউনিটি অর্গানাইজার, এলজিইডি সদর) বলেন, এ প্রকল্পের সাইনবোর্ডে তার নাম অনর্থক লিখে দেয়া হয়েছে। সে উক্ত প্রকল্পের ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে ফোন রেখে দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: