সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছে, শিক্ষা প্রতিষ্টানে যেতে সমস্যা কোথায়?

সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছে, শিক্ষা প্রতিষ্টানে যেতে সমস্যা কোথায়?

শাহীন রাসেল:

প্রথম কয়েকমাস স্বাভাবিকভাবে জীবন না চললেও গত কিছুদিন ধরে তো সব স্বাভাবিকভাবেই চলছে। বাসায় বাবা, বড় ভাই নিয়মিত অফিসে যাচ্ছেন, আমরাও প্রয়োজনে বাইরে বা বাজারে যাচ্ছি, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্টানে যেতে সমস্যা কোথায়? মনে করেন, এতদিন সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশনা ছিল, সে সব নির্দেশনা মানলে এইচএসসি পরীক্ষার ও শিক্ষা প্রতিষ্টানে খুললে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে না। এভাবেই কথাগুলি বলছিলেন খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী কাউছার।

করোনার কারণে দীর্ঘ পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষা জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন, হতাশ ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কক্সবাজার জেলার গ্রাম অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ঘরবন্দি জীবনে আর পড়ায় মন বসছে না বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের। পড়াশোনার জন্য পাচ্ছে না সঠিক দিক নির্দেশনা। যদিও বিকল্প হিসেবে শহরের বিদ্যাপীঠগুলো অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা নিলেও সুযোগ-সুবিধার অভাবে গ্রামের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তা থেকে বঞ্চিত।

এ অবস্থায় শিক্ষা খাতে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করে, সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা না গেলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ঝরে পড়বে বলে আশঙ্কা শিক্ষাবিদদের।

জানা গেছে, গেলো ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের পর ১৯ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কয়েক দফা বাড়িয়ে সবশেষ ছুটির মেয়াদ ছিল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। আর গেলো বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানোর কথা জানানো হয়। সে সঙ্গে পিইসি ও এবতেদায়ীর পর এ বছরের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা না হওয়ার কথা জানানো হয়।

অন্যদিকে, পরীক্ষা হওয়া ও না হওয়ার দোলাচলে দিন কাটছে এপ্রিলে স্থগিত হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের পরীক্ষা হবে কি হবে না তা নিয়ে আমারা দুশ্চিন্তায় আছি। পরীক্ষার চিন্তা, ভর্তির চিন্তাসহ স্কুল কলেজ খোলা নিয়ে আসলে একটা মানসিক চাপের মধ্যে আছি।

আবার ২০২১ সালের প্রস্তুতি নেয়া এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও আছে, দুশ্চিন্তায়। সব মিলিয়ে, শিক্ষা জীবন নিয়ে আতঙ্ক ভর করেছে শিক্ষার্থীদের মনে। শিক্ষার্থীরা বলেন, আগামী বছরে আমাদের এসএসসি পরীক্ষা কবে হবে তারও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট সব কিছু বন্ধ এ অবস্থায় পড়ালেখার অনেক সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া, অনলাইন ক্লাস করতে আমাদের নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন, অভিভাবকরাও। অভিভাবকরা বলেন, ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়া, পরে বাড়িতে এসে হোম ওয়ার্ক করা। তারা এই নিয়মের মধ্যে থাকা হচ্ছে না। এটা সব চেয়ে বড় সমস্যা। অনলাইনে ক্লাস করার সময় অপ্রয়োজনীয় কথা বলছে। তারা কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে।

বিকল্প হিসেবে শহরের বিভিন্ন বিদ্যাপীঠ অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা নিলেও সুযোগ-সুবিধার অভাবে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অজপাড়া গাঁয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী।

খরুলিয়া তালিমুল কোরআন মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্রী নাদিয়ার বাবা গোলাম কাদের বলেন, সন্তানের পড়ালেখার আগে তার নিরাপদ জীবন, তাই সন্তানকে নিরাপদ রাখাটা বাবা হিসেবে দায়িত্ব। মাদ্রাসায় গেলে সন্তান নিরাপদ থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই বলে মাদ্রাসা খুললে প্রতিদিন স্কুলে পাঠাব কি না- তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সময় পার করছি।

সদর উপজেলায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক খোরশেদ আলম বলেন, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের মানসিক বিকাশের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

স্কুলের আঙিনা সামাজিকতা শেখার অন্যতম জায়গা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্কুলে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক নানা আয়োজন থাকে। স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুরা সেসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

রামু উপজেলার বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক শহিদুল্লাহ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে শিক্ষার্থীদের বড় প্রত্যাশার জায়গা থাকে খেলাধুলা ও বন্ধুমহল।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিকতাও শেখে। স্কুলে বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সঙ্গে মেলামেশা, নানা ধরনের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাদের সমাজের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে।

রামু কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ মোশতাক আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা না করার ফলে তাদের ঝরে পড়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এই খাতে যদি আমরা ভালো করতে না পারি তাহলে আমাদের যে স্বপ্ন আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হব, উচ্চ আয়ের দেশ হব সেগুলো স্বপ্নই থেকে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: