বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন

শীতের আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত কক্সবাজারের কৃষাণ-কৃষাণী

  • সময় সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৯০ বার পড়া হয়েছে

শাহীন মাহমুদ রাসেল::

অধিক লাভের আশায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষে আগ্রহ বেড়েছে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকের মাঝে। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় শীতকালীন বিভিন্ন জাতের সবজির চারা রোপণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এখন কৃষক পরিবারগুলো। নিজেদের প্রয়োজন ছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এসব সবজি।

জেলার ৪টি উপজেলায় এবার আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণ-কৃষাণী। উপজেলার বিভিন্ন ফসলি মাঠে কৃষক শীতের আগাম সবজি চাষ করতে জমি প্রস্তুত করছেন। অনেক জায়গায় শীতের সবজি তুলছে। বাজারে বিক্রি করছে।

বিশেষ করে রামু ও সদরের বিভিন্ন এলাকার মাঠে মাঠে এখন শীতকালীন বিভিন্ন সবজির সমারোহ। লাউ, মুলা, ডাঁটা, লালশাক, ধুন্দল, করলা, ঢেঁড়স, শসা, শিম, বরবটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাকরোল, জালি, কি নেই? শীতকালীন এসব সবজিতে এখন বাজার সয়লাব। আর সেসব সবজি জমির পরিচর্যা, সবজি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি কাজে ভীষণ ব্যস্ত কৃষাণসহ কৃষাণী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা।

রামু উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ জনপদে ঘুরে দেখা গেছে, চাষিরা ব্যাপকহারে শীতকালীন সবজি চাষ করছে। কৃষাণ- কৃষাণীরা চারা গজানোর পর তা পরিচর্যা করছেন। ক্ষেত থেকে আগাছা পরিস্কার এবং পর্যাপ্ত পানি দিচ্ছে। কেউ কেউ ফসলের উপর বিভিন্ন পোকা-মাকড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কীটনাশক ছিটিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি জমিতেই ভালো ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকরা খুব যত্ন সহকারে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তবে মাঠ থেকে পরিপূর্ণ ফল তুলতে আরো বেশ কয়েকদিন সময় লাগবে। শীতের মৌসুমে যে কোন ফসল আগাম চাষ হলে বাজারে এর চাহিদা থাকে বেশি। দামও পাওয়া যায় ভাল। অল্প সময়ে কম খরচে অধিক মুনাফা লাভের জন্য বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ও শিমের চাহিদাই থাকে বেশি।

শীতকালীন শাক-সবজির আগাম চাষ করে সেই বিবর্ণ মাঠ রাঙিয়ে তুলেছেন এলাকার চাষী। আগাম শাক-সবজি বাজারে তুলতে পারলে বেশি টাকা আয় করা সম্ভব। সেই চিন্তা মাথায় রেখে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণে ব্যস্ত চাষি। সময়মতো কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ পেয়ে কৃষক তাদের আগাম সবজির চাষে বাম্পার ফলন লাভের আশা করছেন এ মৌসুমে।

এ সবজি যেমন মানুষের খাবারের চাহিদা পূরণ করবে তেমনই সবজি বিক্রি করে চাষীও লাভবান হবে। সবজি বিক্রি করতে বাজারে নিতে হয় না কৃষককে। পাইকাররা মাঠে এসে ক্ষেত থেকে কিনে নিয়ে যায় বলে জানান কৃষকরা।

কৃষকরা বলেন, আমরা এবার বেগুন, মরিচ, লাউ, কপি, মুলা, লালশাক, শিম, টমেটো, ক্ষিরা রোপণ করছি। মরিচ সারিতে রোপণ করলে যেমন আগাছা পরিষ্কার করতে সুবিধা তেমনি ফলনও ভাল হয়। কীটনাশক ও সার প্রয়োগ করতেও সুবিধা হয়। আগাম সবজি চাষ একটা লাভ জনক ফসল। শীতের আগমনি সময়ে যদি আমরা আগাম সবজি চাষ করে ফলন তুলতে পারি তাহলে আমরা লাভবান হব। এবারও আশা করছি আবহাওয়া যদি ভাল থাকে তাহলে আমরা অনেকটা লাভবান হতে পারব। অল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় দিন দিন তারা এই আগাম সবজি চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন বলেও জানান।

চারা তৈরি থেকে শুরু করে আগাম শাকসবজি রোপনে ব্যস্ত গর্জনিয়া দুছড়ি গ্রামের কৃষক ইদ্রিস জানান, যে কোনো সবজি যদি মৌসুমের শুরুতে বাজারে তোলা যায়, তবে তার দাম বেশি পাওয়া যায়। ইতিমধ্যে মুলা, লালশাক, তিতা করলা, পালংশাক বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষকরা পর্যাপ্ত দামও পাচ্ছে।

সদরের খরুলিয়া কোনার পাড়া গ্রামের ছুরুত আলম তাঁর জমিতে বেগুনের চারা তৈরি করেছেন। বিশেষভাবে ছাউনি দিয়ে জমিতে এই চারা তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য এই নিয়মই পালন করতে হয়। এতে চারা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা যেমন কম থাকে, তেমনি চারাও সতেজ হয়ে ওঠে। তিনি জানান, তাঁর জমিতে লাগানো চারা শীতকালে যারা আগাম বেগুন বাজারে তুলতে চায়, তারা কিনে নেবে। বাঁকখালী নদীর তীরে ব্যাপকহারে সবজি চাষ হয়। এখানথেকে প্রচুর পরিমাণ সবজি স্থানীয় ভাবে চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্যস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

একই গ্রামের চাষি আবদুস সালাম জানান, তিনি এবার ২৬ শতাংশ জমিতে ফুলকপির চাষ করছেন। শীতের আগে শীতকালীন সবজি বাজারে তোলা হলে তার চাহিদা বেশি থাকে। ফলে সেগুলোর দামও বেশি পাওয়া যায়। তিনি আশা করছেন, শীত আসার আগেই তিনি শাকসবজি বাজারে তুলতে পারবেন।

বেগুন চাষি নুরুল ইসলাম বলেন, আমি এবার বেগুন চাষ করছি। গত বছর বেগুন চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছি। আশা করছি, এবারও বেগুন বিক্রি করে মোটামুটি কিছু টাকা আয় করতে পারব।

মুক্তারকুল গ্রামের আগাম সবজি চাষী বজল আহাম্মদ জানান, তিনি প্রায় দুই বিঘা জমিতে ঢেঁড়স ও শসার চাষ করেছেন। তিনি ইতোমধ্যে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার শসা বিক্রি করেছেন। আর ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বিক্রি করা যাবে বলে জানিয়েছে তিনি। তার মোট খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকার মতো।

মাঠকর্মী সুপন বড়ুয়া বলেন, ঝিলংজায় এ বছর ২৫ হেক্টর জমিতে শসা আবাদ সম্পন্ন করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সর্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়ার ফলে এ বছর রোগ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব অনেকটা কম। কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে অনেক লাভবান হচ্ছে।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সরওয়ার তোষার বলেন, সদর উপজেলায় আগাম সবজি চাষ হচ্ছে। বর্তমানে ফসলের অবস্থা ভাল। আগাম সবজি বেগুন, টমেটো, শিম এসব বাজারে নিতে কৃষকরা চেষ্টা করছেন। আবহাওয়া বর্তমানে যে অবস্থায় আছে যদি এমন থাকে আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে তা পূরণ হবে।

স্থানীয় কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে সবজি চাষে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অলাভজনক ফসল চাষাবাদ দিয়ে এখানকার কৃষক আগাম সবজি চাষে উৎসাহিত হবে বলে অভিমত কৃষি বিভাগের। এতে করে কৃষক লাভবান হবার পাশাপাশি বর্ষাকালে বাজারে সবজির চাহিদা পূরণে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আবুল কাশেম বলেন, জেলায় এবার ৮ হাজার ৭শ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষাবাদ হবে। প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশ ভালো থাকলে এবার বাম্পার ফলনের আশা করছি। এ লক্ষ্যে আমরা স্থানীয়ভাবে কৃষকদের নানা রকম সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।

তিনি আরোও বলেন, আগাম চাষ করা সবজির বাজারমূল্য ভাল থাকায় এখানকার কৃষক এসব সবজি চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছে। ফলে দিন দিন অলাভজনক ফসল চাষের পরিবর্তে তারা শীতকালীন সবজির আগাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে এখানে দিন দিন বাড়ছে আগাম সবজির আবাদ। আর উৎপাদিত ওসব সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের জেলা-উপজেলাসহ ঢাকা শহরে বিক্রি করা হচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: