বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন

চালবাজি ও সরকারের দায়িত্ব

  • সময় বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২০
  • ২৩৪ বার পড়া হয়েছে

সম্পাদকীয়:

ইউরোপের দেশ লাটভিয়াতে সম্প্রতি একটি অনলাইন জরিপে উঠে আসে যে সেখানে হিটলারের মাইন কাম্ফ বইটি হ্যারি পটারের থেকে বেশি জনপ্রিয়। বিষয়টি দেশের প্রায় সব নিউজ এজেন্সি প্রচার করলো। হিটলারের জনপ্রিয়তা এটাই প্রমাণ করে যে, লাটভিয়ায় নাৎসি মতবাদ জনপ্রিয় হচ্ছে,অর্থাৎ মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি বাস্তবে তাই? বিবিসির সাংবাদিক স্টিভ রসেনবার্গের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো, লাটভিয়ায় হিটলারের বই বিক্রি হয় না বললেই চলে। আর লাটভিয়ার সব লাইব্রেরির মিলে গত তিন বছরে হ্যারি পটারের বই যেখানে ২৫ হাজার বার চাওয়া হয়েছে, সেখানে মাইন কাম্ফ হয়েছে মাত্র ১৩৯ বার! যেই অনলাইন সংস্থা জরিপটি করেছে ,অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো তার ৭০% ভোটই ভুয়া আইডি ব্যবহার করে দেয়া হয়েছে।

উপরে যে ঘটনাটি বললাম, ইংরেজিতে একে বলে ডিজইনফরমেশন (Disinformation), বাংলা করলে যার অর্থ হয় গুজব, যদিও গুজব বলতে আমরা যা বুঝি, এটা তার থেকে খানিক উন্নত। সোভিয়েত রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি আবিষ্কৃত এই ভয়ঙ্কর মনস্তাত্ত্বিক মারণাস্ত্রটি ঠান্ডাযুদ্ধকালীন আমেরিকাকে নাজেহাল করে ছেড়েছিল, এমনকি আশির দশকে, রিগ্যান প্রশাসনের আগ পর্যন্ত আমেরিকা ঠিকমতো বুঝেই উঠতে পারেনি যে তারা এটার দ্বারা কতটা ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হচ্ছিল। সেই সময় কমিউনিস্ট রুমানিয়ার গোপন সংস্থার প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল ইয়ন মিহাই পাসিপা আমেরিকায় পালিয়ে আসেন। এরপর তিনি ডিজইনফরমেশন নামে একটি আস্ত বই লিখে ফেলেন, ফাঁস করে দেন কেজিবির প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের অনেক গোপন নথি।

ডিসইনফরমেশন পলিসির মূল কাজ হলো ভুয়া খবর তৈরি করা এবং বিশেষ কৌশলে তাকে প্রচার করা এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। যেহেতু স্টিভের মতো সব খবর সাধারণ জনগণের পক্ষ্যে যাচাই করা সম্ভব না, সেই সুযোগে একটি মিথ্যাকে বারবার প্রচার করা হয়, যেন মানুষ সেই মিথ্যা খবরটি বিশ্বাস করতে শুরু করে। এমনকি সেই বিশ্বাস সাধারণ জনগণের মধ্যে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে,পরবর্তীতে সেটা মিথ্যা প্রমাণিত হলেও পূর্বের ট্রমা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হয় না। আশির দশকে কেজিবি পরিচালিত অপারেশন ইনফেকশন (Operation Infection) দ্বারা খবর ছড়ানো হলো যে আমেরিকা এইচআইভি ভাইরাস সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। পরবর্তীতে এটা শতভাগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও আজও অনেকে এটাকে সত্য বলে মনে করে। সাহিত্য, সিনেমা, গান এমনকি রাজনীতিতেও এই ন্যারেটিভটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। সরকারকে সাধারণ জনগণের কাছে অ-জনপ্রিয় করে ও সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দিয়ে শত্রু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এরকম শতশত মনস্তাত্বিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছিল সেই সময়।

এই মনস্তাত্ত্বিক ভাইরাসটি আশির দশক হতে সারা পৃথিবীব্যাপীই প্রয়োগ হয়েছে। সরকারের সাফল্যে সরকারবিরোধীরা হিংসার বশবর্তী হয়ে সেই সাফল্যকে কলঙ্কিত বা অপদস্ত করতে চেয়েছে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে, কিংবা প্রকৃত সত্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। বিশ্বব্যাপী মৌলবাদী জঙ্গিদের দ্বারা এই ডিজইনফরমেশন পলিসি ব্যাপকভাবে ব্যাবহৃত হয়েছে যেমন: সরকারকে নাস্তিক, ধর্মবিরোধী বা জনবিরোধী প্রমাণ করতে মিথ্যা ও কাল্পনিক গল্প প্রচার, লিফলেট বিতরণ, কিংবা একটা স্যাবোটাজ করে সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপানো। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এমন এক বহুল আলোচিত প্রচার ছিল যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে। খুব সম্ভবত, অনেক মানুষ এই মিথ্যাটাকে বিশ্বাসও করেছিল। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ গুজবের জন্য যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। গত একযুগে অনেক উদাহারণও তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশে ডিজইনফরমেশন ঠেকানোর জন্য পলিসি হচ্ছে, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বাজেট বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। মার্ক জাকারবার্গ তো ইতোমধ্যে কাঠগড়ায়ও দাঁড়িয়েছেন।

বাংলাদেশ এই ইস্যুতে কতদূর এগিয়েছে জানি না, তবে করোনাক্রান্তিতে এর একটা ভয়াবহ ফল আশঙ্কা করছি। পুলিশ, প্রশাসন, ডাক্তার, স্বাস্থকর্মী, ব্যাংকারদের সাহসী ভূমিকা জনগণের প্রশংসা এবং শ্রদ্ধা অর্জন করলো। কিন্তু খোদ জনগণের দ্বারা নির্বচিত প্রতিনিধিরাই কেন যেন পারল না। যেই দেশ প্রায় দেড়যুগের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলো, সেই দেশের মানুষ আজ ত্রিশ বছর পরও গণতন্ত্রে ভরসা পেল না। নিজ এলাকার প্রতিনিধির বদলে সে ত্রাণ চাইল সেনাবাহিনী আর পুলিশের কাছে। জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে অসৎ লোক আছে, কথাটা মিথ্যা না, সমস্যাটাও নতুন না। চাল আগেও চুরি হয়েছে। বরং এবার যেভাবে প্রশাসন ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে তদারকি করছে,পূর্বে কখনও করেছে বলে মনে হয় না। যারা চুরি করেছে, তাদের অনেকেই ধরা পড়ছে, শাস্তি হচ্ছে। তারপরও বিষয়টা যেভাবে গুজবে রূপ নিচ্ছে, সেটাতো এই মুহূর্তের জন্য খুবই বিপজ্জনক। ইতোমধ্যেই একজন ইউপি চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছেন যে তিনি ত্রাণের চালই বরাদ্দ পাননি, অথচ হয়ে গেছেন চালচোর।

দেশের এই ক্রান্তিকালে সরকারের ওপর ভরসা রাখা অতীব জরুরি। আমাদের বুঝতে হবে যে এই মুহূর্তে আমাদের লাশ বহনের ভারও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। পরিবার ফেলে দিলেও, সরকার ফেলতে পারছে না। এ রকম জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে। শুধু আওয়ামী লীগ সরকার কেন, পৃথিবীর কোনো দেশের সরকারেরই মন্ত্রী-এমপি-জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। যেকোনো কাজের গঠনমূলক সমালেচনা করুণ, কিন্তু ঘরে বসে গুজবের শিকার যেন আমরা না হই। দয়া করে যেকোনো তথ্যের সত্যতা আগে যাচাই করুন। আর জনপ্রতিনিধিদের এভাবে গণধোলাই দেয়ার আহ্বান জানালে এই মুহূর্তে সেটা ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনবে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। তাতে অবশ্যই কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ হাসিল হবে, তবে সাধারণ জনগণকে কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: