শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন

পর্যটক শহরে মধ্যবিত্তদের পাশে কেউ নেই, চক্ষুলজ্জায় মুখে হাসি

  • সময় শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২০
  • ১৫৭ বার পড়া হয়েছে

শাহীন মাহমুদ রাসেল::

কক্সবাজার শহরসহ ও আশেপাশের আবাসিক এলাকায় উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের বসবাস বেশি। লকডাউনের কারণে হঠাৎ করেই বিচ্ছিন্ন জনপদে পরিণত হয়েছে এই পর্যটন শহর। এতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকার বাসিন্দাদের।

কক্সবাজার শহরে ইলেকট্রিক দোকানের ব্যবসা আছে কবিরের (ছদ্মনাম)। ভালোই চলে তার দোকান। দু’জন কর্মচারীও আছেন। তিন ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন ভাড়া বাসায়। ব্যবসা থেকে যে আয় হয় তাতেই সংসারটা ভালোভাবে চলে যায়। কিন্তু তার কোনো সঞ্চয় নেই। গত তিন বছর ব্যবসা করলেও এমন সংকটে কখনোই পড়েননি তিনি। এক সপ্তাহ ধরে দোকান বন্ধ। হাতে কিছু টাকা ছিল তা দিয়ে ১০ দিনের বাজার করেছেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে কঠিন অনিশ্চয়তায় পড়ে অন্ধকার দেখছেন চোখেমুখে।

কীভাবে দোকান ভাড়া দেবেন, কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না তার। মাঝেমধ্যে গভীর রাতে আঁতকে ওঠেন তিনি। কিন্তু কাউকে এমন কষ্টের কথা বলতেও পারছেন না। অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বলেন, বড় লোকের টাকার অভাব নেই। গরিবরা ত্রাণ পায়। আর মধ্যবিত্তরা না খেয়ে চোখের পানি লুকায়। কাউকে প্রকাশ করতে পারে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি চাকরি করেন কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে। বেশ ভালোই বেতন পেতেন। এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে বর্তমানে হোটেল-মোটেল সব বন্ধ। এর আগ থেকেই বিদেশি পর্যটক না আসায় দুই মাস ধরে বেতন হচ্ছে না। এই অবস্থায় চিন্তায় তার মাথায় হাত। কী করবেন, কী করা উচিত, ভেবে উঠতে পারছেন না।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে সারাদেশে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে গৃহবন্দি সাধারণ মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে খাবার এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য তুলে দিচ্ছেন অনেকেই। সরকারও গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের পাশে নেই কেউ। ঘরে খাবার না থাকলেও মধ্যবিত্তরা লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না। সারাদেশের মতো কক্সবাজারের লাখ লাখ মধ্যবিত্তের অবস্থাও প্রায় একই।

টেকপাড়া এলাকায় কথা হয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের লোক। আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, এটা কোনো জীবন হলো। সংসার চালাতে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। চক্ষুলজ্জায় কষ্টগুলো প্রকাশ করা যায় না। ওই যে আমরা মধ্যবিত্ত। আমাদের কোনো কষ্ট নেই। আছে শুধু সুখ। কিন্তু এর আড়ালে আমরা যে কত কষ্টে জীবনযাপন করি, তা বোঝানো যায় না। কেউ বোঝারও চেষ্টা করে না।

করোনায় কক্সবাজারে একজন আক্রান্ত হওয়া এবং সারা দেশে কয়েকজন মারা যাওয়ার ঘটনায় সারা দেশের মতো কক্সবাজার জেলাও লকডাউন হয়ে আছে এক সপ্তাহ ধরে। ফলে ঘরবন্দি কয়েক লাখ মানুষ। সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে প্রতিদিনই কেউ না কেউ খাবার বিতরণ করেন। কিন্তু মধ্যবিত্তরা আছেন বড় বিপদে।

উপজেলা এলাকায় বসবাস করেন এমন একজন মাংস ব্যবসায়ী বলেন, নিম্নবিত্তের লোকজন তো সরকারি ত্রাণ পাচ্ছে, বেসরকারি সহায়তা পাচ্ছে, কিন্তু মধ্যবিত্তের কী হবে? তার ঘরে খাবার শেষ হয়ে আসছে। এখন অল্প অল্প করে খাচ্ছেন। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকালে বুকটা ফেটে যায়। কারণ তারা কখনোই খাবারের কষ্ট করেনি। খাবার টেবিলে বসলে কান্না আসে।

যারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করেন, তারা পড়েছেন বেশি বিপদে। যেমন তসলিমা আক্তার সুমী (ছদ্মনাম) নবীন আইনজীবী। কক্সবাজার শহরে ভাড়া বাড়িতে থাকেন তিনি। করোনাভাইরাসের কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তার উপার্জন আপাতত বন্ধ। মাস শেষে তার নির্ধারিত বেতন নেই। তার ভরসা প্রতিদিনের কাজের ওপর, মামলার ওপর। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুরো বাড়িভাড়া দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় তার পক্ষে।

মধ্যবিত্তদের দুর্দশার কথা কেউ কেউ ফেসবুকেও তুল ধরছেন। একজন লিখেছেন, সবাই গরিব নিয়ে ব্যস্ত, আপনার পাশের মিডেল ক্লাস ফ্যামিলিটারও খবর নিয়েন, বাসায় বাজার সদায় আছে, নাকি মুখ চেপে না খেয়ে দিন পার করছে?

আব্দুর রহমান নামের একজন লিখেছেন, বিত্তবান লোকেরা জমানো টাকা ভেঙ্গে খাচ্ছে, নিম্নবিত্ত লোকেরা অনুদান দিয়ে চলতেছে, আর মধ্যবিত্তরা লজ্জায় দিন কাটাচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: