বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ০৪:০১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দৈনিক আলোকিত উখিয়ায় আপনাকে স্বাগতম

করোনাভাইরাস এবং বাংলাদেশ

  • সময় বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২০
  • ২৭২ বার পড়া হয়েছে

সম্পাদকীয়:

বিশ্বের শতাধিক রাষ্ট্রে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত হয়েছে লক্ষাধিক লোক এবং এই পর্যন্ত তিন হাজারের অধিক লোক মারা গেছে। করোনাভাইরাস চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে আরম্ভ হয়েছে এবং চীনে শুধু যে জনস্বাস্থ্যে ক্ষতি হয়েছে তা নয়, তার অর্থনীতিও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর চীনের অর্থনীতির ধাক্কা পড়ছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে।

এখন বাংলাদেশও করোনাভাইরাস হানা দিয়েছে। এ পর্যন্ত তিন ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। যে তিনজন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে দুইজনের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা বিভাগ- আইইডিসিআর। আক্রান্তদের দুইজন সুস্থ হয়েছেন এবং দ্বিতীয় পরীক্ষার পর হাসপাতাল থেকে তাদেরকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে ।

করোনার আগমনী বার্তা এসেছে মধ্য জানুয়ারি থেকে। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া উদ্যোগে যে ঘাটতি রয়েছে তা ধরা পড়েছে বিমানবন্দর দিয়ে আক্রান্ত দুই রোগী চলে আসায়। বিমানবন্দরে যদি করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের কার্যক্রম চালুই থাকে তবে ইতালি থেকে আসা দুইজন রোগী ভাইরাস নিয়ে প্রবেশ করলো কীভাবে! সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের নেওয়া প্রতিরোধ প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে তাও ধরা পড়লো, তিনজন রোগী শনাক্ত হওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে মাস্ক, স্যানিটাইজার উধাও হয়ে যাওয়ায়। মাস্ক, সেনিটাইজার বাজারে পর্যাপ্ত থাকলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট, কালোবাজারি করতে পারতো না।

করোনা বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় ধাক্কাটি দিয়েছে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান উদযাপনে। আগামী ১৭ মার্চ ২০২০ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিতব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের প্রধান অনুষ্ঠানটি স্থগিত করার ফলে বিদেশি মেহমান যারা অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তাদের নিমন্ত্রণও স্থগিত হয়ে গেছে। ছোট্ট পরিসরে এখন ১৭ মার্চ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে এবং টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে শুরু হবে বর্ষব্যাপী বিস্তৃত অনুষ্ঠানমালার সূচনা। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন।

করোনার আগমনী বার্তা এসেছে মধ্য জানুয়ারি থেকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া উদ্যোগে যে ঘাটতি রয়েছে তা ধরা পড়েছে বিমানবন্দর দিয়ে আক্রান্ত দুই রোগী বিনা নোটিশে চলে আসায়। বিমানবন্দরে করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণের কার্যক্রম চালু থাকলেও কতটা কার্যকর এই নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে। সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের নেওয়া প্রতিরোধ প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে তাও ধরা পড়লো, তিনজন রোগী শনাক্ত হওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে মাস্ক, স্যানিটাইজার উধাও হয়ে যাওয়ায়। মাস্ক, সেনিটাইজার বাজারে পর্যাপ্ত থাকলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট, কালোবাজারি করতে পারতো না।

সরকার এখন সেনিটাইজারের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেটি আগেই করা উচিত ছিল। করোনা যদি ব্যাপকতা পায় দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এটি কীভাবে সামাল দিবে এক আল্লাহ জানে! এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা মুণি নানা তথ্য দিচ্ছে করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। সরকারিভাবে এই গুজব মিশ্রিত তথ্য প্রতিরোধে নিজস্ব কোনও পদক্ষেপ ও প্রচার নেই বললেই চলে।

সার্বিক পরিস্থিতে দেখা যাচ্ছে করোনার আক্রমণ যতটুকু ভয়াবহ তার চেয়ে শতগুণ করোনা ভীতিতে আক্রান্ত সারা বিশ্ব। চীনের পরেই সংখ্যানুসারে বেশি আক্রান্ত দেশগুলো হচ্ছে ইটালি, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানী, ইউএসএন, জাপান এবং সুইজারল্যান্ড। সমগ্র বিশ্ব থেকে চীনারা এক ঘরে হওয়ার অবস্থা। চীনের পর্যটনখাত সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। তার ধাক্কা লেগেছে অন্যত্র। একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এয়ারলাইন্স। ২০১৯ সালে প্রথম তিন মাসে চীন থেকে ভ্রমণে বেরিয়েছিল ১৭ কোটি মানুষ, এখন তা শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে। কোনোখানে চীনাদেরকে সাদরে গ্রহণ করছে না বিশ্ববাসী। সুতরাং চীনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে।

বিভিন্ন দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বন্ধ করে দেওয়ার আওয়াজ উঠেছে। দর্শকের অভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে সিনেমা হল এবং পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে সিনেমা মুক্তির তারিখ। বড় জন সমাবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। এমন কী পবিত্র দুই নগরী মক্কা-মদিনায় সফর এবং ওমরাহ হজ্ব বন্ধ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। শেয়ারবাজারে ও তেলের মূল্যে ধস নামায় বিশ্বমন্দার পদধ্বনি দেখা দিয়েছে। ভারতের রপ্তানি বন্ধের ঘোষণায় বিশ্বে ঔষধ সঙ্কটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মোটকথা অনেকটা গৃহবন্দি থাকাকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এর মাধ্যমে।
শুধু চীন বা বিশ্ববাণিজ্যে করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে তাই না, প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। চীন থেকে এখনো কাঁচামাল আমদানী সেভাবে শুরু না হওয়ায় তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী বিভিন্ন খাতের পণ্য উৎপাদন নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানি হয় এমন দেশগুলোতেও করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে থাকায় রফতানিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশংকা তৈরি হয়েছে।

খবরে দেখলাম, বাংলাদেশ থেকে কাঁকড়া ও কুঁচের ৯০ শতাংশই রফতানী হয় চীনে। চীনের ক্রেতারা কেনা বন্ধ করাতে এখন তাদের রফতানি বন্ধ। আর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রফতানির আগে প্যাকিংয়ের জন্য কাঁকড়া এবং কুঁচে মাছ আনা হতো ঢাকার আশ পাশে গড়ে উঠা প্রায় ৬০টির মতো কাঁকড়া ও কুঁচে প্যাকিং সেন্টারে। এখন ১০/১২টি চালু আছে। বাকি সব বন্ধ।

এটা স্পষ্ট যে, করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। এটা আরো বাড়বে কারণ চীন থেকেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পণ্যগুলোর কাঁচামাল আমদানি করা হয়। এরইমধ্যে করোনার কারণে চীন থেকে কাঁচামাল আমদানি কমেছে।

মার্চের প্রথম সপ্তাহে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চীন থেকে যদি সারাবিশ্বে কাঁচামাল রফতানি ২ শতাংশও কমে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি হবে ৫০ বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশে ক্ষতি হবে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

এর আগে বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশনও একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে রফতানির ১৩টি খাতকে চিহ্নিত করেছে, যেগুলো করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারে। বলা হয়েছে এসব খাতে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। খাতগুলোর মধ্যে আছে প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। এছাড়া ওষুধ শিল্প, পাট, সুতা, ইলেক্ট্রনিক্স, সামুদ্রিক মাছ, প্রসাধনী ইত্যাদি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এসব খাতের পণ্য উৎপাদনের জন্য কমবেশি নির্ভর করেন চীন থেকে আনা কাঁচামাল কিংবা যন্ত্রাংশের উপর।

করোনাভাইরাসের আগেই বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল। বিশ্বের অর্থনীতির প্রধান তিন শক্তি আমেরিকা, চীন এবং জাপান- করোনাভাইরাসের কারণে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে স্থবিরতা আসছে, তাতে বিশ্ব ভয়াবহ মন্দার সম্মুখীন হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
%d bloggers like this: