বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৪৫ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
দৈনিক আলোকিত উখিয়ার অনলাইন পোর্টালে আপনাকে স্বাগতম। আপনার চারপাশে চলমান অনিয়ম দুর্নীতির খবর আমাদের জানান। দেশকে বাচাঁন দেশকে ভালবাসুন

কেঁচো খুঁড়তে সাপ : স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালকের ঢাকায় বাড়ি, গ্রামে কয়েকশ’ বিঘা জমি

  • সময় শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৯
  • ৭২ বার পড়া হয়েছে

স্বাস্থ্য খাতে দু’র্নীতির প্রতীক হয়ে ওঠা অ্যাকাউন্টস অফিসার আবজালের সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসছে।এতদিন যারা প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে নিজেদের মুখোশ আড়াল করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবার তাদের সব হা’রানোর দিন ঘনিয়ে আসছে।

আবদুল মালেক ওরফে মালেক ড্রাইভা’র। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অ’তিরিক্ত মহাপরিচালকের (পরিকল্পনা) গাড়ি চালান। কোটিপতি কর্মচারীর তালিকায় তার নামও আছে।কুমিল্লার বাসিন্দা মালেক ঢাকায় বিত্তবান জীবনযাপন করেন। রাজধানীর কামা’রপাড়ায় তার ৭ তলা বাড়ি রয়েছে। এছাড়া তিনি গ্রামের বাড়িতে কয়েকশ’ বিঘা কৃষি জমি কিনে সেখানে গবাদি পশুর খামা’র গড়ে তুলেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মক’র্তা বলেন, মালেক ড্রাইভা’র স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক শাহ মনিরের আমলে বিপুল ক্ষমতাধর ছিলেন। কারণ শাহ মনির তার পরাম’র্শের বাইরে কিছুই করতেন না। গাড়ি চালককে দিয়ে ঘুষের টাকা আদায় করতেন শাহ মনির। অবশ্য চালাকি করেও তার শেষ রক্ষা হয়নি। একটি প্রকল্পে অ্যাম্বুলেন্স কেনায় দু’র্নীতি করে ধ’রা খেলে তার বি’রুদ্ধে বিভাগীয় মা’মলা হয়।

এক পর্যায়ে পেনশন ছাড়াই সরকারি চাকরি থেকে বিদায় নিতে হয় তাকে। এছাড়া ২০১০ সালে শাহ মনির স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক থাকার সময় প্রায় আড়াই হাজার স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়। এ নিয়োগে মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্যের অ’ভিযোগ ওঠে। সাবেক মহাপরিচালক শাহ মনিরের সঙ্গে সখ্যের সুবাদে মালেক ড্রাইভা’র ওরফে হাজী আবদুল মালেক বিপুল অংকের অ’বৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ পান।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রশাসনিক কর্মক’র্তা কবির চৌধুরী। কোটিপতি দু’র্নীতিবাজ কর্মচারী হিসেবে তার নাম আছে প্রথম সারিতে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে কবির চৌধুরী চাকরি করছেন ২১ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট এ কর্মচারী একবারের জন্যও অন্যত্র বদলি হননি। কবির চৌধুরীসহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের শতাধিক কর্মক’র্তা-কর্মচারীর অঢেল বিত্তবৈভবের সন্ধান মিলেছে। দু’র্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এসব সম্পদের অনুসন্ধানে শিগগিরই নামছে একটি বিশেষ সংস্থা।

সূত্র বলছে, অক্টোবরে স্বাস্থ্য সহকারী থেকে এমটিপিআই (মেডিকেল টেকনোলজিস্ট) পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। প্রার্থীদের প্রতিজনের কাছে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ বাণিজ্য হয়। এছাড়া স্যানেটারি ইন্সপেক্টর পদে আড়াই হাজারজনকে পদোন্নতি দেয়ার সময়ও ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অ’ভিযোগ ওঠে।

এ সিন্ডিকে’টের সঙ্গে জ’ড়িত ছিলেন সাবেক পরিচালক এবিএম মাজহারুল ইস’লাম, প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার ও কবির চৌধুরী। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কাজের তদবির করেও কোটি কোটি টাকা আয় করে কবির চৌধুরী ও তার সিন্ডিকেট।

দুদকের জালে ধ’রা পড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের অ্যাকাউন্টস অফিসার আবজালের খালাতো ভাই খায়রুলের সম্পদের পরিমাণ নিয়ে অধিদফতরে নানা কানাঘুষা আছে।কেউ কেউ বলেন, নামে-বেনামে খায়রুলের ঢাকায় অন্তত ৬টি বাড়ি আছে। এছাড়া তার নামে-বেনামে একাধিক ব্যাংকে মোটা অংকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও সঞ্চয়পত্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নি করা আছে।

খায়রুল মূলত বিভিন্ন টেন্ডার ও প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় তদবিরের সঙ্গে জ’ড়িত। তিনি বড় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহ কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য কমিশন বাণিজ্য করেন। বর্তমানে মেডিকেল এডুকেশন শাখায় ক্যাশিয়ার পদে কর্ম’রত খায়রুলের নাম উঠেছে কোটিপতি কর্মচারীর তালিকায়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এনসিডিসি বিভাগের অফিস সহকারী ইকবাল হোসেনও কম যান না। তার নামেও রাজধানীতে কয়েকটি ফ্ল্যাট ও বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইকবাল প্রথমে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি প্রকল্পে নৈশপ্রহরী (নাইটগার্ড) হিসেবে চাকরি পান। পরে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে অফিস সহকারী পদে স্থা’নান্তর হন তিনি। এরপর ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরে যোগ দেয়ার পর বিপুল অংকের অর্থবিত্ত যেন স্বেচ্ছায় তার হাতে ধ’রা দেয়।

সূত্র বলছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক বিভিন্ন সচেতনতামূলক স্বাস্থ্য বার্তা প্রচারেও সরকারি অর্থের হরিলুটের অ’ভিযোগ পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য বার্তা প্রচার সংবলিত একেকটি বিলবোর্ডে সরকারের সর্বনিু খরচ ৩ লাখ টাকা। প্রতি উপজে’লায় অন্তত ৩ থেকে ৫টি বিলবোর্ড লাগায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ বিলবোর্ড স্থাপনে ঘুষ বাণিজ্য করেন অধিদফতরের ইউএইচ অ্যান্ড এফপিও কর্মক’র্তারা।

সূত্র জানায়, অধিদফতরের কর্মক’র্তা-কর্মচারীদের কমিশন বাণিজ্যের কারণে নিুমানের বিলবোর্ড লাগিয়ে দায় সারেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। পিভিসি পেপার প্রিন্ট করে কোনোমতে একটি বিলবোর্ড লাগিয়ে বিল তুলে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।নিম্নমানের হওয়ায় বছর না ঘুরতেই বিলবোর্ড নষ্ট হয়ে যায়। তখন নতুন করে বিলবোর্ড লাগানোর জন্য ফের টেন্ডার আহ্বানের প্রয়োজন পড়ে। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের লোকসান হলেও দু’র্নীতিবাজদের পকেট ভা’রি হতেই থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক প্রশাসনের ব্যক্তিগত কর্মক’র্তা (অফিস সহকারী) আবু সোহেলকে শুধু কোটিপতি বললে ভুল হবে। তিনি অঢেল সম্পদের মালিক। অথচ তিনি বরিশাল সদর হাসপাতা’লে নিরাপত্তা প্রহরী (সিকিউরিটি গার্ড) হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর নানা কৌশলে ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। ঢাকায় আসার পর তিনি পদোন্নতিও বাগিয়ে নেন।

সিকিউরিডি গার্ড থেকে বনে যান প্রশাসনিক কর্মক’র্তা (এও)। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে বিপুল প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার দাপটের কারণে নানা কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চিকিৎসকরাও আবু সোহেলকে স্যার বলে ডাকতে বাধ্য হন।

সোহেলের এ প্রভাবের অন্যতম কারণ তিনি অন্তত ১৫ বছর ধরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একই জায়গায় চাকরি করছেন। তার গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি হওয়ায় বরিশাল বিভাগে কর্ম’রত ডাক্তার থেকে শুরু করে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী পর্যন্ত সব স্তরে বদলি, পদোন্নতির তদবির করেন তিনি। একাধিক নিকটাত্মীয়কেও তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরে চাকরি দেন।

অধিদফতরের কর্মক’র্তা-কর্মচারীরা বলছেন, পার শাখার অফিস সহকারী মাসুদ করিমের মোবাইল ফোনে একটার পর একটা রিং বাজতেই থাকে। সারাক্ষণ তিনি মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। কারণ একটাই।তিনি চিকিৎসকদের বদলি সংক্রান্ত কাজ করেন কমিশনের বিনিময়ে। চাকরির শুরু থেকেই তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ১৫ বছরের মধ্যে একবারও তার অন্যত্র কোথাও বদলির আদেশ হয়নি।

দু’র্নীতিবাজ কর্মচারী হিসেবে বিশেষ সংস্থার স’ন্দেহের তালিকায় আছেন অধিদফতরের এইডস প্রোগ্রামের প্রশাসনিক কর্মক’র্তা জালাল উদ্দিন। তার বি’রুদ্ধে দু’র্নীতির একাধিক লিখিত অ’ভিযোগ পাওয়া যায়। কোটিপতির খাতায় তিনি নাম লিখিয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে জালাল উদ্দিন সিদ্ধহস্ত। তিনি প্রথমে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি প্রকল্পে চাকরি পান। প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে তিনি আ’দালতে রিট করে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হন।প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এ কর্মচারী অফিসে যাতায়াতসহ ব্যক্তিগত কাজেও একটি সরকারি পাজেরো গাড়ি সার্বক্ষণিক ব্যবহার করছেন। অথচ পদম’র্যাদা অনুযায়ী কোনোমতেই গাড়ি প্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ তার নেই।

সূত্র জানায়, রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেন অনেক আগেই কোটিপতির খাতায় নাম লেখান। রাজশাহী শহরে তিনি ৬ তলা সুরম্য আবাসিক ভবন গড়েছেন। একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি আছে তার। ঢাকা এবং রাজশাহীতে একাধিক ফ্ল্যাটও কিনেছেন।

শুধু আনোয়ার একা নন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের অফিস সহকারী নাজমা, দিদার রসুল ও স্টেনোগ্রাফার আবু সায়েমের নামেও বিশেষ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ার প্রকল্পের ক্যাশিয়ার মোক্তার হোসেনের অঢেল অর্থ-বিত্তের তথ্য পাওয়া গেছে। পাবনা এলাকায় তিনি একটি পরিবহন কোম্পানি পরিচালনা করেন। নামে-বেনামে ওই পরিবহন কোম্পানিতে অন্তত ৫০টি ট্রাক রয়েছে।

এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিকল্পনা শাখার স্টেনো টাইপিস্ট সুনীল বাবুও কোটিপতি কর্মচারীর হিসেবে বিশেষ সংস্থার নজরদারিতে আছেন।

সূত্র বলছে, বিপুল পরিমাণ অ’বৈধ সম্পদ অর্জনের অ’ভিযোগে গোয়েন্দা অনুসন্ধানের আওতায় আছেন বেসরকারি হাসপাতাল শাখার সাবেক কর্মচারী কাম’রুল ইস’লাম ও ইপিআই শাখার কর্মচারী তোফায়েল আহমেদ। দু’জনেই স্বাস্থ্য অধিদফতরে ব্যাপক প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত।

কিছুদিন আগে কাম’রুলকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউএইও শাখায় বদলি করা হয়। কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকতে হয়নি তাকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ফের হাসপাতাল শাখায় সদর্পে ফিরে আসেন।

এছাড়া অনুসন্ধান শুরু হয়েছে ইপিআই শাখার অ্যাকাউন্টস অফিসার মুজিবুল হক মুন্সী ও ইপিআই স্টোরের সাবেক ম্যানেজার হেলাল তরফদারের বি’রুদ্ধে। এদের মধ্যে হেলাল তরফদারের বি’রুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার অডিট আ’পত্তি থাকলেও কিছুদিন পরই তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরে অ্যাকাউন্টস অফিসার আবজাল হোসেন দুদকের জালে ধ’রা পড়ার পর আতঙ্কে আছেন তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাফি ও দেলোয়ার। এদের মধ্যে কাফি বর্তমানে মুগদা জেনারেল হাসপাতা’লে প্রশাসনিক কর্মক’র্তা (এও) পদে কর্ম’রত আর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতা’লে আছেন দেলোয়ার হোসেন। এ তিন দু’র্নীতিবাজ কর্মচারী স্বাস্থ্য অধিদফতরে ‘ত্রিরত্ন’ নামে পরিচিত। সূত্র- যুগান্তর

Comments Below
  •  
  •  
  •  

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ
Shares